ঢাকার সাভারে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ‘জুলাই পদযাত্রা’ পরবর্তী সমাবেশে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় জড়িত সন্দেহে যুবলীগের দুই নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
আজ মঙ্গলবার (৭ জুন) ভোররাত চারটার দিকে সাভার পৌর এলাকার আনন্দপুর মহল্লা থেকে ঢাকা জেলা উত্তর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও থানা পুলিশ যৌথ অভিযান চালিয়ে তাঁদের আটক করে। পরে এনসিপির দায়ের করা মামলায় তাঁদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন—মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার জয়মন্টপ ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও বর্তমান যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মো. নুরুল ইসলাম (৫২) এবং সাভারের স্থানীয় যুবলীগ কর্মী মো. সজীব (৩২)। নুরুল ইসলাম সিংগাইরের বাসিন্দা হলেও বর্তমানে সজীবের মতো সাভারের আনন্দপুর মহল্লাতেই বসবাস করছিলেন।
আজ দুপুরে কড়া নিরাপত্তায় প্রিজন ভ্যানে করে দুই আসামিকে ঢাকার আদালতে পাঠানো হয়েছে। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও সাভার মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শাখাওয়াত ইমতিয়াজ দৈনিক যায়যায়দিনকে বলেন, 'এনসিপির সমাবেশস্থলে হামলার ঘটনায় ভোর রাত ৪টায় সাভারের আনন্দপুর থেকে সভার ডিবি পুলিশ ও থানা পুলিশের যৌথ অভিযানে নুরুল ইসলাম ও সজীব নামের দুইজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার নুরুল ইসলাম (৫২) মানিকগঞ্জের সিংগার থানার মৃত সুলতান ফকিরের ছেলে সে জয়মন্ডপ ইউনিয়ন যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক । এবং মোঃ সজিব (৩২) সাভার উপজেলার আনন্দপুর এলাকার আব্দুল জলিলের ছেলে সে সভার যুবলীগের একজন কর্মী। ঘটনার প্রকৃত রহস্য ও পরিকল্পনাকারীদের চিহ্নিত করতে আদালতে তাঁদের ৭ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়েছে'।
পুলিশ ও দলীয় সূত্রে জানা গেছে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা ধরে রাখা ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গতকাল সোমবার রাতে সাভার থানা বাসস্ট্যান্ড থেকে এনসিপির একটি পদযাত্রা শুরু হয়। পদযাত্রাটি প্রায় এক কিলোমিটার দূরে তারাপুর ঈদগাহ মাঠে (সাভার থানা স্ট্যান্ড ঈদগাহ মাঠ) গিয়ে সমাবেশে রূপ নেয়।
রাত পৌনে ১০টার দিকে ঢাকা জেলা উত্তর এনসিপির আহ্বায়ক প্রকৌশলী নাবিলা তাসনিদের বক্তব্য চলাকালীন মঞ্চের সামনে হঠাৎ বিকট শব্দে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটে। এ সময় মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলামসহ দলটির কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ। বিস্ফোরণের পরপরই সমাবেশস্থলে তীব্র আতঙ্ক ও বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ে।
হামলার ঘটনায় ৪ জন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। আহত ব্যক্তিরা হলেন—মো. শাহীন খন্দকার (৩০), মো. জসিম (২৬), মো. শাহাদাত হোসেন (৪০) ও ইমরান হোসেন। তাঁদের উদ্ধার করে সাভারের বেসরকারি এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসকেরা জানান, আহতদের মধ্যে একজনের পায়ের আঘাত কিছুটা গুরুতর।
বিস্ফোরণের ঘটনার পরপরই ক্ষোভে ফেটে পড়েন এনসিপির নেতা-কর্মীরা। রাত ১০টায় সমাবেশ শেষে তাঁরা সাভার মডেল থানার সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন।
এ সময় এনসিপি আহ্বায়ক ও এমপি নাহিদ ইসলাম তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "একটি রাজনৈতিক দলের গণতান্ত্রিক কর্মসূচি করার পূর্ণ অধিকার আছে। কিন্তু স্থানীয় পুলিশ-প্রশাসন পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। প্রশাসনকে এর জবাব দিতে হবে।" তিনি আরও অভিযোগ করেন, এই এলাকায় ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীদের পুনর্বাসনের চেষ্টা চলছে এবং এই হামলার পেছনে প্রশাসনের একশ্রেণির কর্মকর্তার পরোক্ষ যোগসাজশ থাকতে পারে।
এদিকে, হামলার তীব্র নিন্দা ও ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এক বিবৃতিতে বলেন, "সমাবেশের শুরুতে আকস্মিক বিদ্যুৎ চলে যাওয়া এবং পরবর্তী সময়ে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো স্থানীয় প্রশাসনের স্পষ্ট ব্যর্থতার বহিঃপ্রকাশ।"
ঘটনার পর সাভারের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশি তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে। ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) শামীমা পারভীন ঘটনার পর পরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। এবং অনাকাঙ্ক্ষিত এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য ঢাকা জেলা অতিরিক্ত পুলিশ এসপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. জাহাঙ্গীর আলমকে প্রধান করে তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন—সাভার সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাকিবুল হাসান ইশান ও সাভার মডেল থানার পরিদর্শক (ইন্টেলিজেন্স) নূর মোহাম্মদ।
পুলিশের দাবি, ককটেল হামলার মূল পরিকল্পনাকারী এবং এর নেপথ্যে থাকা বাকি আসামিদের খুঁজে বের করতে ডিবি ও থানা পুলিশের একাধিক দল মাঠে কাজ করছে।