নেত্রকোণার বারহাট্টায় স্বামী-পরিত্যক্তা এক নারীকে ধর্ষণের দায়ে হেলাল উদ্দিন (৫৫) নামে এক ব্যক্তিকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে তাকে এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড, অনাদায়ে আরও ছয় মাসের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
বুধবার (৮ জুলাই) দুপুরে নেত্রকোণা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক (সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ) এ.কে.এম. এমদাদুল হক এ রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার সময় দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি আদালতে উপস্থিত ছিলেন।
নেত্রকোণা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটর মো. নুরুল কবীর রুবেল রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, ২০০০ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন (সংশোধিত ২০০৩)-এর ৯(১) ধারায় আদালত আসামিকে দোষী সাব্যস্ত করেন।
মামলায় ১০ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য, আলামত এবং ডিএনএ পরীক্ষাসহ অন্যান্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় আদালত এ দণ্ডাদেশ দেন।
আদালত সূত্রে জানা যায়, দণ্ডপ্রাপ্ত হেলাল উদ্দিন বারহাট্টা উপজেলার স্বল্পদশাল গ্রামের বাসিন্দা।
মামলার নথি ও আদালত সূত্রে জানা যায়, ২০১৩ সালের ১ মার্চ গভীর রাতে স্বল্পদশাল গ্রামে নিজ বসতঘরে দুই মেয়েকে নিয়ে ঘুমিয়ে থাকা এক স্বামী-পরিত্যক্তা নারীর ঘরে বাঁশের দরজা খুলে প্রবেশ করেন হেলাল উদ্দিন। পরে ভয়ভীতি ও প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে ওই নারীকে ধর্ষণ করেন। ঘটনাটি কাউকে জানালে হত্যা করা হবে বলেও হুমকি দেন তিনি।
মামলার সাক্ষ্য অনুযায়ী, ঘটনার পর ভুক্তভোগীর ছোট মেয়ে এবং পাশের ঘরে থাকা এক স্বজন হেলাল উদ্দিনকে ঘর থেকে বের হয়ে যেতে দেখেন। কিছুদিন পর ভুক্তভোগী অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়লে বিষয়টি এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।
স্থানীয়ভাবে একাধিকবার সালিশের মাধ্যমে বিয়ে ও মীমাংসার চেষ্টা হলেও হেলাল উদ্দিন ধর্ষণের অভিযোগ অস্বীকার করেন। পরে কন্যাসন্তান জন্ম নিলেও তিনি শিশুটির পিতৃত্বও অস্বীকার করেন।
এ ঘটনায় মামলা দায়েরের পর পুলিশ তদন্ত শেষে ২০১৩ সালের ১১ অক্টোবর আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে। বিচার চলাকালে আদালতের নির্দেশে ডিএনএ পরীক্ষা করা হলে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত হয়, ধর্ষণের ফলে জন্ম নেওয়া শিশুটির জৈবিক পিতা হেলাল উদ্দিন।
মামলা দায়েরের প্রায় এক বছর পর ভুক্তভোগী নারী স্বাভাবিকভাবে মারা যান। তবে ধর্ষণের ঘটনায় জন্ম নেওয়া কন্যাশিশুটি বর্তমানে ষষ্ঠ শ্রেণিতে অধ্যয়নরত।
পাবলিক প্রসিকিউটর মো. নুরুল কবীর রুবেল বলেন, ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে শিশুটির পিতৃত্ব নিশ্চিত হওয়ায় সে এখন আইনগতভাবে হেলাল উদ্দিনের সন্তান হিসেবে স্বীকৃতি পাবে। ফলে পিতার সম্পত্তিসহ উত্তরাধিকার এবং অন্যান্য আইনগত অধিকার দাবি করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, "এই রায়ের মাধ্যমে শুধু একজন ধর্ষকের শাস্তিই নিশ্চিত হয়নি, বরং একটি শিশু তার পিতৃপরিচয়, সামাজিক স্বীকৃতি এবং আইনগত অধিকার ফিরে পেয়েছে। ডিএনএভিত্তিক এ রায় ভবিষ্যতে এ ধরনের মামলার বিচারে গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।"