ঢাকা | বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬ ইং | ৩০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জেলার শ্রেষ্ঠ বিদ্যালয়, তবু ফাটল ধরা ভবনেই পাঠদান; ঝুঁকিতে ১৬৭ শিক্ষার্থী

author
নেত্রকোণা প্রতিনিধি

প্রকাশিত : ৯ জুলাই, ২০২৬ দুপুর ৩:২৩
ad003
জেলার শ্রেষ্ঠ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের স্বীকৃতি অর্জনের গৌরব একদিকে, অন্যদিকে ফাটল ধরা মেয়াদোত্তীর্ণ ভবনে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পাঠদান—নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলার পুকুরিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এখন এই দুই বিপরীত বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি।

শিক্ষার মানে জেলার সেরা হলেও অবকাঠামোগত সংকটে বিদ্যালয়টি যেন দীর্ঘদিন ধরে উপেক্ষিত।
মোহনগঞ্জ-ধর্মপাশ সড়কের পাশের বামেরচর এলাকায় অবস্থিত বিদ্যালয়টি ১৯৩৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে ১৯৭৩ সালে এটি জাতীয়করণ করা হয়। বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে সাতজন শিক্ষক ও ১৬৭ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। কিন্তু শিক্ষার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ না থাকায় বাধ্য হয়ে ১৯৯৭ সালে নির্মিত মেয়াদোত্তীর্ণ ঝুঁকিপূর্ণ ভবনেই চলছে পাঠদান।

সরেজমিনে দেখা যায়, ভবনটির ছাদে একাধিক ফাটল সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে পলেস্তারা খসে পড়েছে। দরজা-জানালার অনেক অংশ নষ্ট হয়ে গেছে। সামান্য বৃষ্টি কিংবা ঝড়ো আবহাওয়ায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। 

স্থানীয়দের আশঙ্কা, ভূমিকম্প বা অন্য কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে বড় ধরনের প্রাণহানির ঝুঁকি রয়েছে।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০০৬ সালে নির্মিত আরেকটি একতলা ভবনে মাত্র তিনটি শ্রেণিকক্ষ রয়েছে। শিক্ষার্থীর তুলনায় যা একেবারেই অপ্রতুল। ফলে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনটি ব্যবহার করা ছাড়া বিকল্প নেই। এমনকি শিক্ষকদের অফিস কক্ষও ওই ভবনেই পরিচালিত হচ্ছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ভবনটির জরাজীর্ণ অবস্থা দীর্ঘদিনের হলেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। চলতি অর্থবছরে বিদ্যালয়টি ক্ষুদ্র মেরামতের বরাদ্দও পায়নি। অথচ উপজেলার অপেক্ষাকৃত নতুন কয়েকটি বিদ্যালয় এ বরাদ্দ পেয়েছে। সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও জেলার শ্রেষ্ঠ বিদ্যালয়টি এ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অভিভাবক ও এলাকাবাসী।

প্রায় দুই বছর আগে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন নন-ক্যাডার কর্মকর্তা সোহাগ সিদ্দিকী। দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা, অভিভাবকদের সম্পৃক্ত করা, শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি এবং বিভিন্ন উদ্ভাবনী কার্যক্রম চালুর মাধ্যমে বিদ্যালয়ের শিক্ষার মানে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনেন। এরই স্বীকৃতি হিসেবে চলতি বছর বিদ্যালয়টি জেলার শ্রেষ্ঠ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নির্বাচিত হয়েছে।

প্রধান শিক্ষক সোহাগ সিদ্দিকী বলেন, "শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে আমরা নিরলসভাবে কাজ করছি। কিন্তু সবচেয়ে বড় সংকট নিরাপদ শ্রেণিকক্ষের অভাব। বাধ্য হয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে ক্লাস নিতে হচ্ছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থী সবাই সারাক্ষণ আতঙ্কে থাকি। বহুবার বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। দ্রুত নতুন ভবন নির্মাণ ও প্রয়োজনীয় সংস্কারের ব্যবস্থা করা হলে শিক্ষার্থীরা নিরাপদ পরিবেশে পাঠ গ্রহণ করতে পারবে।"

বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির অভিভাবক সদস্য আরিফুল ইসলাম বলেন, "জেলার শ্রেষ্ঠ বিদ্যালয়ের স্বীকৃতি আমাদের জন্য গর্বের। কিন্তু বাস্তবতা হলো, শিক্ষার্থীরা এখনও ভাঙাচোরা ভবনে জীবন ঝুঁকিতে রেখে ক্লাস করছে। দ্রুত নতুন ভবন নির্মাণ এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার না হলে যে কোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।"

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবুল হোসেন বলেন, "ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তথ্য অধিদপ্তরে পাঠানো হয়েছে। নতুন ভবনের বরাদ্দ এখনও পাওয়া যায়নি। ক্ষুদ্র মেরামতের বরাদ্দ অধিদপ্তর থেকেই নির্ধারণ করা হয়, উপজেলা পর্যায়ে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই।"

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আমেনা খাতুন জানান, বিদ্যালয়ের ফাটলসহ জরুরি মেরামতের কাজ দ্রুত সম্পন্ন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নতুন ভবন নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় আবেদনও করা হবে।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শহীদুল আজম বলেন, "বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে খোঁজ নেওয়া হবে। উপজেলা পর্যায় থেকে পাঠানো তথ্য পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।"

জেলার শ্রেষ্ঠ বিদ্যালয়ের মর্যাদা অর্জনের পরও যখন শিক্ষার্থীদের নিরাপদ শ্রেণিকক্ষ নিশ্চিত হয়নি, তখন স্থানীয়দের প্রশ্ন—শুধু স্বীকৃতি দিয়ে কি শিক্ষার মান টেকসই রাখা সম্ভব? তাদের দাবি, শিক্ষার গুণগত উৎকর্ষের পাশাপাশি বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়নেও জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা নিরাপদ পরিবেশে পাঠ গ্রহণ করতে পারে।
সংবাদটি শেয়ার করুন :
প্রতিবেদকের তথ্য
SHA.AZH

SHA.AZH

© স্বত্বাধিকারঃ যায়যায়দিন
কারিগরী সহযোগিতায় MULTISOFT