ঢাকা | শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬ ইং | ৩১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

‎২০ বছর আগে থেমেছিল ৪০ প্রাণ, থেমে আছে স্মৃতিফলকের উদ্যোগও ‎

author
আক্কেলপুর, জয়পুরহাট প্রতিনিধি

প্রকাশিত : ১০ জুলাই, ২০২৬ দুপুর ২:৩২
ad003
বিয়ের বয়স তখন মাত্র তিন মাস। চোখজুড়ে ছিল মালয়েশিয়ায় গিয়ে নতুন জীবনের স্বপ্ন। সেই স্বপ্নের প্রথম ধাপ হিসেবে পাসপোর্ট সংগ্রহ করতে ২২ বছরের মাছুম হুদা বাসে চড়ে রওনা হয়েছিলেন জয়পুরহাটের পথে। কিন্তু বাড়ি থেকে মাত্র দেড় কিলোমিটার দূরের আমুট্ট রেলক্রসিংয়ে মুহূর্তেই সবকিছু বদলে যায়। ভয়াবহ ট্রেন-বাস সংঘর্ষে গুরুতর আহত হয়ে তিনি টানা এক সপ্তাহ অচেতন ছিলেন। জ্ঞান ফেরে হাসপাতালের বিছানায়-ততক্ষণে জীবনের পথও বদলে গেছে।

‎আজ ১১ জুলাই। জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলার আমুট্ট রেলক্রসিংয়ের সেই মর্মান্তিক ট্রেন-বাস দুর্ঘটনার দুই দশক পূর্ণ হলো। ২০০৬ সালের এই দিনে দেশের ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ রেল দুর্ঘটনায় অন্তত ৪০ জন নিহত এবং আরও অন্তত ৩৮ জন আহত হন। কিন্তু ২০ বছর পরও নিহতদের স্মরণে প্রতিশ্রুত স্মৃতিফলক নির্মিত হয়নি। ফলে দুর্ঘটনায় স্বজন হারানো পরিবারগুলোর ক্ষোভ ও আক্ষেপ আজও রয়ে গেছে।

‎বর্তমানে ৪২ বছর বয়সী মাছুম হুদা আক্কেলপুর পৌর শহরে মোটরসাইকেলের যন্ত্রাংশের ব্যবসা করেন। তবে শরীর ও মনে এখনো বহন করছেন সেই দুর্ঘটনার ক্ষতচিহ্ন।

‎মাছুম হুদা বলেন, ২০০৬ সালে আমার বয়স ছিল ২২ বছর। তিন মাস আগে বিয়ে করেছি। মালয়েশিয়া যাওয়ার সব প্রস্তুতি প্রায় শেষ ছিল। জয়পুরহাটে পাসপোর্ট করতে দিয়েছিলাম। সেদিন সকালে পাসপোর্ট আনতে খেয়া পরিবহনের বাসে উঠি। বাসে প্রচণ্ড ভিড় ছিল। আমুট্ট রেলগেটে পৌঁছানোর পর যাত্রীদের চিৎকার শুনেছিলাম। এরপর আর কিছুই মনে নেই। এক সপ্তাহ পর হাসপাতালে জ্ঞান ফিরেছিল।

‎তিনি বলেন, দুর্ঘটনায় আমার মেরুদণ্ডের হাড় ভেঙে যায়। বাংলাদেশ ও ভারতে দীর্ঘদিন চিকিৎসা নিতে হয়েছে। চিকিৎসায় প্রায় ১৪ থেকে ১৫ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। এখনো সেই দুর্ঘটনার যন্ত্রণা শরীরে বয়ে বেড়াচ্ছি।

‎২০০৬ সালের ১১ জুলাই সকাল ১০টা ২২ মিনিটে আক্কেলপুর উপজেলার আমুট্ট রেলক্রসিংয়ে যাত্রীবাহী খেয়া পরিবহনের একটি বাসের সঙ্গে আন্তঃনগর রূপসা এক্সপ্রেস ট্রেনের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। ঘটনাস্থলেই বহু যাত্রীর মৃত্যু হয়। আহতদের স্থানীয় হাসপাতালসহ বিভিন্ন চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়া হয়। এ দুর্ঘটনা সারা দেশে শোকের ছায়া নেমে এসেছিল।

‎দুর্ঘটনার পর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী পৃথকভাবে শোক প্রকাশ করেন। স্থানীয়ভাবে তিন দিনের শোক পালন করা হয়। নিহতদের পরিবারকে সরকারি আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। একই সঙ্গে আক্কেলপুর পৌরসভার পক্ষ থেকে প্রতিবছর শোক দিবস পালন এবং দুর্ঘটনাস্থলে স্মৃতিফলক নির্মাণের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দুই দশক পেরিয়ে গেলেও সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি।

‎ওই দুর্ঘটনায় আক্কেলপুর পৌর এলাকার শান্তা গ্রামের একই পরিবারের তিনজন-বাবা ও তাঁর দুই ছেলে-নিহত হন।

‎নিহত ব্যক্তিদের স্বজন মোর্শেদ বলেন, সেদিন একই বাসে আমার বাবা ও দুই ভাই জয়পুরহাট যাচ্ছিলেন। দুর্ঘটনায় তিনজনকেই হারিয়েছি। ২০ বছর ধরে একই সঙ্গে বাবা ও দুই ভাইকে হারানোর শোক বয়ে বেড়াচ্ছি। দুর্ঘটনার পর সেখানে স্থায়ী গেট ও গেটম্যান দেওয়া হয়েছে। কিন্তু নিহতদের স্মরণে এখনো কোনো স্মৃতিফলক নির্মাণ হয়নি।

‎আক্কেলপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও আক্কেলপুর পৌরসভার সাবেক মেয়র কামরুজ্জামান কমল বলেন, এটি দেশের স্মরণকালের অন্যতম ভয়াবহ ট্রেন-বাস দুর্ঘটনা। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া নিহত ও আহতদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দিয়েছিলেন। গত বছর তৎকালীন ইউএনও মনজুরুল আলম স্মৃতিফলক নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি বদলি হওয়ার পর সেই উদ্যোগ আর এগোয়নি।

‎আক্কেলপুর রেলস্টেশনের স্টেশনমাস্টার হাসিবুল আলম বলেন, দুর্ঘটনার সময় রেলক্রসিংটি অরক্ষিত ছিল। সেখানে কোনো গেটম্যান ছিল না। দুর্ঘটনার পর স্থায়ী গেট নির্মাণ করা হয়েছে। এখন ২৪ ঘণ্টা পালাক্রমে গেটম্যান দায়িত্ব পালন করেন। ফলে রেলক্রসিং দিয়ে যানবাহন ও মানুষের চলাচল আগের তুলনায় অনেক বেশি নিরাপদ হয়েছে।

‎
সংবাদটি শেয়ার করুন :
প্রতিবেদকের তথ্য
SH.AL

SH.AL

© স্বত্বাধিকারঃ যায়যায়দিন
কারিগরী সহযোগিতায় MULTISOFT