ঢাকা | বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬ ইং | ২৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিশু সুরক্ষায় ‘শূন্য সহনশীলতা’

author
শশাঙ্ক সাদী

প্রকাশিত : ১৩ জুলাই, ২০২৬ বিকেল ৪:৪০
ad003
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গল্পে কাদম্বিনী যেমন মরে প্রমাণ করেছিলেন যে তিনি আগে মরেন নাই তেমনি অসংখ্য শিশু ভয়ংকরভাবে যৌন নিপীড়ন ও হত‍্যাকান্ডের শিকার হয়ে বারবার প্রমাণ করছে যে বাংলাদেশে শিশু সুরক্ষার বর্ম কতটা শতছিদ্র। এটি মেনে নেয়া কঠিন যে কাগজে-কলমে কঠোর আইন থাকা সত্ত্বেও আমাদের সমাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু দুর্বল সদস্যরা কতটা মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। যখন একটি চার, পাঁচ, ছয় বা আট বছরের শিশু তার নিজের পাড়াতেই নিরাপত্তা খুঁজে পাচ্ছে না তখন শিশু ও নারীর সাথে ঘটা সকল প্রকার যৌন ও শারীরিক আক্রমণ, নির্যাতন ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে 'শূন্য সহনশীলতা' (জিরো টলারেন্স) কেবল একটি আমলাতান্ত্রিক স্লোগানে পরিনত হয়েছে। অথচ রাষ্ট্রের ব্যবস্থাগত সংস্কারের জন্য ‘শূন্য সহনশীলতা’কে একটি আপসহীন আদেশে পরিণত করা জরুরি ভাবে আবশ্যিক। 

রামিসা মামলা: জাতীয় সংকটময় মুহূর্ত
১৯ মে, ২০২৬ তারিখে পল্লবীর মিল্লাত ক্যাম্প এলাকার একটি বাড়িতে আট বছরের রামিসা নৃশংস যৌন আক্রমণ ও হত্যাকান্ডের শিকার হওয়ার পরে প্রধান অভিযুক্ত সোহেল রানা ও তার স্ত্রীকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দ্রুত গ্রেপ্তার করা প্রমাণ করে যে জনচাপ প্রবল হলে রাষ্ট্রও দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে বাধ‍্য হয়। প্রচণ্ড জনবিক্ষোভ এবং প্রধান সন্দেহভাজন সোহেল রানাকে আইনি সুরক্ষা দিতে স্থানীয় বার অ্যাসোসিয়েশনের অস্বীকৃতি — এই তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া এমন এক সমাজকে তুলে ধরে যা শিশুর বিরুদ্ধে নৃশংসতায় পুরোপুরি ক্লান্ত। যদি আমরা এই তাৎক্ষণিক ক্ষোভের ঊর্ধ্বে তাকাই, একটি উদ্বেগজনক প্রশ্ন থেকেই যায়: সহিংসতা কেন ক্রমাগত বেড়েই চলেছে? 

রামিসা কি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা? না বরং এক বিধ্বংসী জাতীয় ধারার অন‍্যতম নাম। সরকারের ১০৯৮ শিশু হেল্পলাইনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে নির্যাতনের অভিযোগের সংখ্যা বিস্ময়করভাবে ২২৮% বৃদ্ধি পেয়েছে। ২১ মে, ২০২৬ তারিখে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) থেকে প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, শুধুমাত্র পহেলা জানুয়ারি থেকে ২০ মে ২০২৬-এর মধ্যে অন্তত ১১৮ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে এবং আরও ৪৬ জন ধর্ষণের চেষ্টার সম্মুখীন হয়েছে। একই সময়ে, ধর্ষণের পর অথবা ধর্ষণের ব্যর্থ চেষ্টার পর অন্তত ১৭টি শিশু নিহত হয়েছে। আসক উল্লেখ করেছে যে এই ঘটনাগুলো কেবল বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; এগুলো রাষ্ট্রের সুরক্ষা ব্যবস্থার ব্যর্থতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার এক বৃহত্তর সংকটকে প্রতিফলিত করে। এই চলমান প্রবণতাকে গভীর ভাবে দেখলে এর ব্যাপকতা আরও বেশি উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে। ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসেই ধর্ষণের শিকার হওয়া ৫৬ জনই ছিল ১২ বছরের কম বয়সী মেয়ে, যার মধ্যে ছয় বছরের কম বয়সী শিশুরাও আছে। শুধু মে মাসের প্রথম ১১ দিনেই ১৮টি ধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যার মধ্যে ১১টিই ছিল নাবালকদের নিয়ে। জুন মাসে আরো ১৭৭ জন কন‍্যা শিশু নির্যাতনের শিকার আর প্রাণ হারিয়েছে সাতজন শিশু। মানবাধিকার সংস্থাগুলো ক্রমাগত সতর্ক করে আসছে যে প্রকৃত সংখ্যা সম্ভবত এর চেয়ে অনেক বেশি কারণ সামাজিক কলঙ্ক ও ভয়ের কারণে ব্যাপকভাবে শিশু নিপীড়ন ও নির্যাতনের ঘটনা গোপন রাখা হয়। এই বাস্তবতা আমাদের একটি উদ্বেগজনক সত্যের মুখোমুখি হতে বাধ্য করে যে বাংলাদেশ একটি গুরুতর মনস্তাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক সংকটের সঙ্গে লড়াই করছে যা সক্রিয়ভাবে যৌন, শারিরীক ও মানসিক নিপীড়কসুলভ আচরণকে উৎসাহিত করছে। 

শিশুদের ওপর নৃশংসতা অবশ্যই প্রতিরোধ করতে হবে
বাংলাদেশে লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা নিয়ে জাতীয় পর্যায়ের অনুসন্ধানে দেখা যায় যে, নির্যাতনকারীদের মানসিকতা খুব কমই বিচ্ছিন্ন উন্মাদনা থেকে তৈরি হচ্ছে। বরং এটি এক ধরণের পুরুষতান্ত্রিক পাশবিক অধীনস্ততাবোধ এবং নির্ভীকতার এক বিষাক্ত মিশ্রণে চালিত হয়। 
বাংলাদেশে প্রচলিত সামাজিক ব‍্যবস্থা নারী ও শিশুদের অধিকারসম্পন্ন ব্যক্তি হিসেবে সম্মান করা শেখানোর পরিবর্তে আধিপত্য বিস্তার করা যায় এমন অসহায় বস্তু হিসেবে দেখতে ছেলে শিশু ও পুরুষ নিপীড়কদের অভ্যস্ত করে তোলে। অন‍্যদিকে যৌন নিপীড়নের অপরাধে সাজাপ্রাপ্তদের ওপর নেয়া সাক্ষাৎকারগুলো থেকে একটি গুরুতর মনস্তাত্ত্বিক প্রবণতা পাওয়া যায়। নিপীড়কদের বেশিরভাগই বিশ্বাস করে না যে তারা কখনও প্রকৃত শাস্তির মুখোমুখি হবে। অনানুষ্ঠানিক, ও স্থানীয় মধ্যস্থতার (সালিশ) মতো মারাত্মক ত্রুটিপূর্ণ একটি ব‍্যবস্থা ঐতিহাসিকভাবে প্রভাবশালী নিপীড়কদের টাকা বা হুমকি দিয়ে আইনি পরিনতি থেকে বেরিয়ে আসতে সাহায্য করেছে। এটি এমন একটি মানসিক হিসাব তৈরি করে, যেখানে ক্ষমতার দাপট বা দায়মুক্তির রোমাঞ্চ আইনি পরিণতির যেকোনো ভয়কে ছাপিয়ে যায়।

২০২৬ সালের ২৩শে মে বাংলাদেশে নিযুক্ত ইউনিসেফ প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্সের বিবৃতিতে প্রতিধ্বনিত হয়েছে যে ‘‍’অপরাধীদের দায়মুক্তির সংস্কৃতির অবসান ঘটাতে হবে," এবং এর জন্য শক্তিশালী তদন্ত ও বিচার ব্যবস্থা, প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা, শিশুবান্ধব পুলিশ ও বিচার ব্যবস্থা, সামাজিক সুরক্ষা এবং ভুক্তভোগীদের জন্য মনস্তাত্ত্বিক সহায়তা ইত্যাদি একাধিক জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। ইউনিসেফ বিশেষভাবে "স্কুল, মাদ্রাসা, কর্মক্ষেত্র, পাড়া-মহল্লা এবং পরিচর্যা কেন্দ্রগুলোতে শিশু সুরক্ষার জল‍্য আরও কঠোর জবাবদিহিতার" আহ্বান জানায়। এই সব প্রতিষ্ঠানগুলোতে সরাসরি নিন্দা ও অভিযোগ জাননোর সুযোগ না থাকায় স্থানগুলো নিপীড়কদের কার্যকলাপ চালানোর সুযোগ করে দেয়। জনসাধারণ ও গণমাধ্যমের কাছে ভুক্তভোগীদের ছবি, ভিডিও বা পরিচয় প্রকাশকে ইউনিসেফ "আরও একটি নির্যাতন" হিসেবে আখ্যা দেয় এবং এই ধরনের সংবাদ প্রকাশ করা বন্ধ করার আবেদন জানায় কারণ এতে করে ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের মানসিক আঘাত আরও তীব্র হয়।

২০২৬ সালে ইউনিসেফ এই প্রথমবার সতর্কবার্তা দেয়নি। মার্চ মাসে দেওয়া এক পূর্ববর্তী বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছিল যে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চের মাঝামাঝি পর্যন্ত প্রায় ৫০টি শিশু ধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে — এবং মার্চ মাসের একটি দিনেই সাতটি শিশু নিহত হয় ও সহিংসতার ছয়টি নিশ্চিত ঘটনা রিপোর্ট করা হয়।

শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ কেন ব্যর্থ হচ্ছে
কাগজে-কলমে দক্ষিণ এশিয়ায় শিশু সুরক্ষার জন্য অন্যতম শক্তিশালী আইনি কাঠামো রয়েছে বাংলাদেশে। নারী ও শিশু নির্যাতন নিপীড়ন আইন, ২০০০ (সংশোধিত ২০০৩) অনুযায়ী শিশু ধর্ষণের জন্য মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে এবং ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার সম্পন্ন করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি জেলায় বিশেষায়িত ট্রাইব্যুনাল রয়েছে।

কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন এক চিত্র তুলে ধরে।

পুলিশের রেকর্ড অনুযায়ী, ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের জানুয়ারির মধ্যে প্রায় ১০,০০০ ধর্ষণের মামলা নথিভুক্ত হয়েছে—অর্থাৎ প্রতিদিন প্রায় ১৩ জন ভুক্তভোগী। দেশের বিশেষায়িত ট্রাইব্যুনালগুলোতে নারী ও শিশু সম্পর্কিত দেড় লক্ষেরও বেশি মামলা বিচারাধীন রয়েছে, যেখানে প্রতিটি ট্রাইব্যুনাল একই সাথে ১,৫০০টিরও বেশি মামলা পরিচালনা করছে। হাইকোর্টের তথ্য থেকে জানা যায় যে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে ৩০,৩৬৫টি মামলা পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে বিচার ব্যবস্থায় আটকে থাকবে। সাজা প্রদানের হার সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্রটি তুলে ধরে। ইউনিসেফ বাংলাদেশের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে শিশুদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া ৫,৬০০-এর বেশি যৌন সহিংসতার মামলার মধ্যে মাত্র দুই শতাংশের মীমাংসা ও  সাজা হয়েছে। ২০২৫ সালের প্রথম আট মাসে শিশু-সম্পর্কিত মামলায় সাজার হার কমে মাত্র ০.৫২ শতাংশে নেমে আসে—অর্থাৎ, দায়ের করা ২,৬৯৮টি মামলার মধ্যে মাত্র ১৪টির মীমাংসা ও  সাজা হয়েছে।

ডিজিটাল প্রতিধ্বনি কক্ষ এবং "রিল" সংবেদনহীনতা
অনিয়ন্ত্রিত ডিজিটাল সংস্পর্শের কারণে বাংলাদেশের মনস্তাত্ত্বিক পরিমণ্ডল দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। তরুণ ও যুবকদের ভোগের ধরণ পর্যবেক্ষণকারী সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো ডিজিটাল মিডিয়ার অভ্যাস এবং বাস্তব জগতের সহিংসতার মধ্যে একটি সরাসরি যোগসূত্র তুলে ধরেছে 

অ্যালগরিদমিক সংবেদনহীনতা: স্বল্পদৈর্ঘ্যের বিষয়বস্তুর (যেমন টিকটক, ফেসবুক রিলস এবং ইউটিউব শর্টস) ব্যাপক প্রসার একটি অত্যন্ত আসক্তিমূলক পরিবেশ তৈরি করেছে। দেখার সময় সর্বাধিক করার জন্য অ্যালগরিদমগুলো নিয়মিতভাবে চাঞ্চল্যকর, আক্রমণাত্মক বা গভীরভাবে বস্তুনিষ্ঠ বিষয়বস্তু প্রচার করে। বছরের পর বছর ধরে এই ধরনের বিষয়বস্তুর সাথে ক্রমাগত সংস্পর্শে থাকার ফলে মৌলিক সহানুভূতি ভোঁতা হয়ে যায় এবং নারীদের প্রতি আক্রমণাত্মক আচরণ স্বাভাবিক হয়ে ওঠে।

প্রযুক্তি-সহায়তায় নির্যাতন: ডিজিটাল জগৎ বাস্তব জগতের সহিংসতার প্রশিক্ষণ ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। নারীদের ভয় দেখাতে এবং চুপ করিয়ে দিতে প্রায়শই অনলাইন হয়রানি, ট্রোলিং এবং সাইবার-বুলিং ব্যবহার করা হয়। এই ডিজিটাল বৈরিতা সহজেই বাস্তব জগতে ছড়িয়ে পড়ে, যা পিছু ধাওয়া, শারীরিক আক্রমণ এবং গার্হস্থ্য নির্যাতন হিসেবে প্রকাশ পায়।

সংকটের কাঠামোগত মূল কারণসমূহ

ক্ষুদ্র হয়রানির স্বাভাবিকীকরণ: রামিসার হত্যার মতো গুরুতর অপরাধ বিচ্ছিন্নভাবে ঘটে না। এগুলো শিশু ও নারীর ওপর নির্যাতন বিস্তৃতির এক চরম প্রান্ত। এগুলো শুরু হয় উপেক্ষিত "ছোটখাটো" হয়রানি, রাস্তার হয়রানি (ইভ-টিজিং) এবং গার্হস্থ্য নির্যাতন দিয়ে। যখন সমাজ আগ্রাসনের ছোট ছোট কাজগুলোকে উপেক্ষা করে, তখন তা নীরবে নির্যাতনকারীদের ও নির্যাতনমনস্কদের সংকেত দেয় যে, বড় ধরনের অপরাধের জন্য পরিবেশটি নিরাপদ।

ভুক্তভোগীকে লজ্জিত করার সংস্কৃতি: সমাজ-মনোবিজ্ঞানের একটি ব্যাপক দ্বৈত নীতি নৈতিক দায় নির্যাতনকারীদের কাছ থেকে ভুক্তভোগীর উপর চাপিয়ে দেয়। পরিবারগুলো প্রায়শই সামাজিক কলঙ্কের ভয়ে নির্যাতন লুকিয়ে রাখে, যা অপরাধীদের লুকিয়ে থাকতে এবং একই এলাকার মধ্যে নতুন শিকার খুঁজে পেতে সাহায্য করে।

আসক তাদের ২১ মে-র বিবৃতিতে স্পষ্টভাবে বলেছে: "বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দীর্ঘায়িত বিচারিক প্রক্রিয়া এবং দুর্বল তদন্ত শিশুদের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।" যখন নিপীড়কদের শাস্তির কোনো বিশ্বাসযোগ্য ভয় থাকে না তখন আইন যতই কঠোর হোক না কেন তা তাদের নিবৃত্ত করতে পারে না।

প্রতীকী বিচার থেকে সরে এসে জবাবদিহিতার দ্রুত বাস্তবায়ন
রামিসা মামলায় এক সপ্তাহের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশকে অবশ্যই একটি স্থায়ী দৃষ্টান্ত হিসেবে স্থাপন করতে হবে। এটিকে কেবল জাতীয় মনোযোগ আকর্ষণকারী মর্মান্তিক ঘটনার জন্য সংরক্ষিত ব্যতিক্রম হিসেবে রাখা যাবে না।
প্রকৃত ‘শূন্য সহনশীলতা’ প্রতিষ্ঠা করতে রাষ্ট্রকে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো অবশ্যই বাস্তবায়ন করতে হবে:
১। বাধ্যতামূলক সময়সীমাসহ বিশেষায়িত শিশু ধর্ষণ অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল। একটি নতুন অধ্যাদেশ এই ধরনের ট্রাইব্যুনালকে বাধ্যতামূলক করেছে এবং তদন্ত ও মামলা নিষ্পত্তির জন্য সময়সীমা নির্ধারণ করেছে। 

২। পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলো প্রয়োগ। যেসব বিষয়গুলো যেমন আইনি অস্পষ্টতা, মামলা দায়েরের অসঙ্গতি এবং বয়স-সম্পর্কিত সীমা ইত‍্যাদি বর্তমানে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণে বাধা সৃষ্টি করছে সেগুলোকে অবশ্যই আইনগত স্বচ্ছতা এবং বিচারকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সমাধান করতে হবে। 

৩। ত্রুটিহীন, স্বাধীন ফরেনসিক তদন্ত। প্রমাণ সংগ্রহের ব্যর্থতাই মামলা ভেস্তে যাওয়ার একটি প্রধান কারণ। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে অবশ্যই নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে অকাট্য ফরেনসিক প্রমাণ দাখিল করার জন্য প্রশিক্ষিত, সুসজ্জিত এবং জবাবদিহি করতে হবে। এর মাধ্যমে অপরাধীদের পদ্ধতিগত কারণে পার পেয়ে যাওয়ার সুযোগের কাঠামোগত ফাঁকফোকর দূর করতে হবে।

৪। বিচার প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা। তদন্তের গতি এবং কঠোরতার ক্ষেত্রে অভিযুক্তের আর্থ-সামাজিক অবস্থা অবশ্যই সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক হতে হবে। ইতিহাস বলে প্রভাবশালী অপরাধীরা বিচার প্রক্রিয়া বিলম্বিত করার জন্য অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থা (সালিশ) এবং রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার নেটওয়ার্ককে কাজে লাগায়। বাধ্যতামূলক সময়সীমা এবং স্বাধীন তদারকিই হলো এর কাঠামোগত প্রতিকার।

৫। ট্রাইব্যুনালের জট কমানো। দেড় লক্ষেরও বেশি মামলা বিচারাধীন থাকায়, নতুন মামলাগুলো একটি জটযুক্ত ব্যবস্থায় যুক্ত হয়। সরকারকে অবশ্যই অতিরিক্ত বিচারিক সক্ষমতা, শিশু মামলার জন্য একটি বিশেষ প্রসিকিউটর ক্যাডার এবং বিলম্ব চিহ্নিতকারী ডিজিটাল কেস-ট্র্যাকিং সিস্টেমে বিনিয়োগ করতে হবে।

সুরক্ষামূলক কাঠামো পুনর্গঠন: মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়, বিদ্যালয় এবং কম‍্যুনিটি
মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় (MoWCA), ইউনিসেফের সাথে অংশীদারিত্বে ‘অ্যাক্সিলারেটিং প্রোটেকশন ফর চিলড্রেন (APC)’ প্রকল্পের অধীনে, জাতীয় এবং উপ-জাতীয় পর্যায়ে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা শক্তিশালী করতে এবং একটি সম্প্রদায়-নেতৃত্বাধীন শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে কাজ করে আসছে। ইউনিসেফের সহায়তায় সমাজসেবা বিভাগ দ্বারা পরিচালিত চাইল্ড হেল্পলাইন ১০৯৮, শুধুমাত্র ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর মাসের মধ্যেই ৪২৫,০০০-এর বেশি কল পেয়েছে, যার মধ্যে ৩৫৪,০০০-এর বেশি কল নির্যাতন, শোষণ বা মনস্তাত্ত্বিক দুর্দশা সম্পর্কিত ছিল — এর মাধ্যমে ৩৩,০৭২ জন শিশুকে চরম সহিংসতা, গৃহহীনতা, বাল্যবিবাহ বা শোষণ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।

এগুলো নগণ্য সাফল্য নয়। কিন্তু ২০২৬ সালের তথ্য থেকে এটা স্পষ্ট যে, সহিংসতার গতিপথ পরিবর্তন করার জন্য এগুলো যথেষ্ট ছিল না।
প্রতিরোধের জন্য তিনটি স্তরে পদক্ষেপ প্রয়োজন:
- পরিবার: পরিবারগুলোকে অবশ্যই শারীরিক সুরক্ষা সংক্রান্ত সাংস্কৃতিক নিষেধাজ্ঞা ভাঙতে হবে এবং শিশুদেরকে লজ্জা ছাড়াই সীমানার সুস্পষ্ট পরিভাষা শেখাতে হবে। ইউনিসেফের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী প্রতি ৮ জন নারী-মেয়ের মধ্যে ১ জন ১৮ বছর বয়সের আগে ধর্ষণ বা যৌন নিপীড়নের শিকার হয় — এবং বাংলাদেশে পরিচালিত গবেষণাগুলো নিশ্চিত করে যে, অপরাধীরা প্রায়শই ভুক্তভোগীদের পরিচিত হয়ে থাকে। রামিসা মামলাটি এর একটি মর্মান্তিক উদাহরণ: অভিযুক্ত ছিল একজন প্রতিবেশী।

- বিদ্যালয়: সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে স্থানীয় মাদ্রাসা পর্যন্ত প্রতিটি বিদ্যালয়কে অবশ্যই আনুষ্ঠানিক শিশু সুরক্ষা নীতি গ্রহণ করতে হবে, যার মধ্যে থাকবে বাধ্যতামূলকভাবে পূর্ব পরিচয় যাচাই, ভৌত প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণ এবং বেনামে অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা। আসক-এর ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, কমপক্ষে ২২ জন কন‍্যা শিশু শিক্ষকের দ্বারা যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক শিশু সুরক্ষার অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিদ্যালয় ও মাদ্রাসাগুলোর শক্তিশালী দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। 

- কম‍্যুনিটি: গুরুতর অপরাধ হঠাৎ করে ঘটে না। এগুলো কোন একটি ধারার চরম প্রান্ত। শুরু হয় অবহেলিত ছোটখাটো হয়রানি থেকে। এসব তথাকথিত ছোটখাটো যৌন হয়রানি নিয়ে যথন কম‍্যুনিটি নীরব থাকে তখন যৌন সহিংসতার বিষবাষ্প ছড়িয়ে পড়ে। ভুক্তভোগীকে দোষারোপ করার সংস্কৃতিকে চ্যালেঞ্জ করে এমন স্থানীয় নেতৃত্বের  সুরক্ষা কমিটি বিদ‍্যমান আইন সংস্কারের পূর্বশর্ত, পরিপূরক নয়।

শূন্য সহনশীলতার দ্বৈত ধার: প্রয়োগ এবং যথাযথ প্রক্রিয়া
প্রকৃত ‘শূন্য সহনশীলতা’র অর্থ হলো প্রকৃত যৌন নিপীড়কদের জন্য কোনো ফাঁকফোকর না থাকা। কিন্তু এটিকে ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা বা জনউন্মাদনার হাতিয়ারে পরিণত হওয়া থেকে অবশ্যই রক্ষা করতে হবে। সোহেল রানাকে প্রতিনিধিত্ব করতে বার অ্যাসোসিয়েশনের অস্বীকৃতি গভীর সামাজিক প্রত‍্যখ‍্যানের প্রতিফলন। তবে একটি কার্যকর গণতন্ত্রের জন্য প্রয়োজন যথাযথ প্রক্রিয়া যেখানে সবচেয়ে জঘন্য অপরাধে অভিযুক্তও আইনি প্রতিনিধিত্ব পাবে। এটি অপরাধীকে রক্ষা করার জন্য নয়, বরং নিশ্চিত করার জন্য যে চূড়ান্ত দণ্ডাদেশটি আইনগতভাবে অভেদ্য হচ্ছে এবং অন্যায্য বিচারের অজুহাতে তা বাতিল কখনো বাতিল হয়ে যাবে না। যথাযথ প্রক্রিয়া ন্যায়বিচারের শত্রু নয়; এটি তার নিশ্চয়তা।

একইভাবে, যদিও জনরোষ জবাবদিহিতার জন্য একটি বৈধ শক্তি, তাই তবুও জনরোষ থেকে গণবিচারের দাবি সাংবিধানিক কাঠামোকে ক্ষয় করে। রাষ্ট্রকে অবশ্যই দৃঢ় এবং আইনসম্মত উভয়ই হতে হবে।

ভবিষ্যৎ পথ: একটি নৈতিক ও আইনি আদেশ
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ডের আশেপাশের দশ দিনেই বাংলাদেশ জুড়ে অন্তত ছয়টি শিশু নিহত হয়েছে; তাদের মধ্যে পাঁচজনকে যৌন নির্যাতনের পর হত্যা করা হয়। সকলের বয়স ছিল ১১ বছর বা তার কম। অর্থাৎ যখন একটি শিশু হত্যাকাণ্ড নিয়ে পুরো দেশ যখন উত্তাল সেই সময়েও নির্যাতনকারীরা থেমে ছিলো না। কতটা নৃশংস ও নির্মম-নির্ভীক হলে এটা সম্ভব হয় তা বলার অপেক্ষা রাখে না! 
তাই, সরকারের শূন্য সহনশীলতার জোরালো অঙ্গীকারকে প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতায় রূপ দিতে হবে। তার জন‍্য দরকার — 
১। পর্যাপ্ত কর্মীসহ ট্রাইব্যুনাল যা তাদের নিজস্ব আইনগত সময়সীমা মেনে চলে; পর্যাপ্ত ফরেনসিক সক্ষমতা যা প্রমাণের ফাঁক-ফোকর বন্ধ করে; 
২। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত বিচার ব্যবস্থা; এবং,
৩। একটি সংবেদনশীল জাতীয় পাঠ্যক্রম যা শৈশব থেকেই সহানুভূতি, শারীরিক স্বায়ত্তশাসন এবং শিশু সুরক্ষার সাক্ষরতা গড়ে তোলে।

একটি সমাজ কতটা আলোকিত, সংবেদনশীল এবং আধুনিক হয়েছে শেষ পর্যন্ত তা বিচার করা হয় সে তার শিশুদের কতটা সুরক্ষা দেয় তার ওপর ভিত্তি করে। রামিসার স্মৃতি কেবল অশ্রু আর ক্ষণস্থায়ী ক্ষোভের চেয়েও বেশি কিছু দাবি করে। এটি একটি অনমনীয় ব্যবস্থা দাবি করে যেখানে যৌন নিপীড়করা দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির সম্মুখীন হবে, যেখানে শিশু সুরক্ষা শুধু রাজনৈতিক শ্লোগান না হয়ে হবে একটি অলঙ্ঘনীয় সাংবিধানিক বাস্তবতা। শিশু নির্যাতন ও হত্যা নিয়ে আমাদের ক্লান্তি ও সম্মিলিত শোককে অবশ্যই একটি কাঠামোগত বর্মে রূপান্তরিত করতে হবে যাতে করে আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার জন্য আর কোনো শিশুকে চরম মূল্য দিতে না হয়।

শশাঙ্ক সাদী:  উন্নয়ন ও মানবিক সহায়তা বিশেষজ্ঞ এবং আইজেনহাওয়ার ফেলো
সংবাদটি শেয়ার করুন :
প্রতিবেদকের তথ্য
SH.AL

SH.AL

© স্বত্বাধিকারঃ যায়যায়দিন
কারিগরী সহযোগিতায় MULTISOFT