কদিন আগেও যেখানে শিশুদের হাসি-খেলা ছিল, আজ সেখানে শুধু থৈথৈ পানি। যে ঘরে সন্ধ্যা নামলে জ্বলে উঠত প্রদীপের আলো, আজ সেই ঘরের চালই শেষ আশ্রয়। মায়ের কোলে ক্ষুধার্ত শিশু, অসুস্থ বৃদ্ধ ওষুধের অভাবে কাতর, গর্ভবতী নারী নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে অসহায় দৃষ্টিতে চারদিকে তাকিয়ে আছেন। গবাদিপশু ভেসে গেছে, বছরের পরিশ্রমে ফলানো ফসল পানির নিচে তলিয়ে গেছে, রান্নার চুলায় আগুন জ্বলে না। চারদিকে শুধু পানি আর পানি—কিন্তু সেই পানির মাঝেও এক ফোঁটা বিশুদ্ধ পানির জন্য হাহাকার। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এসব দুর্যোগের তীব্রতা ও ঘনত্ব আরও বেড়েছে। ফলে দেশের বহু অঞ্চলে মানুষ বারবার জীবন, জীবিকা ও নিরাপত্তার সংকটে পড়ছে।
সাম্প্রতিক বন্যায় চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের হাজার হাজার পরিবার হঠাৎ করেই পানিবন্দি হয়ে পড়ে। অনেকের ঘরবাড়ি পানিতে তলিয়ে যায়, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়, নিরাপদ আশ্রয়, বিশুদ্ধ পানি ও খাদ্যের সংকট দেখা দেয়। এমন পরিস্থিতিতে দুর্যোগ মোকাবিলায় বিভিন্ন সরকারি সংস্থা, স্থানীয় প্রশাসন, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং সাধারণ মানুষের পাশাপাশি বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও বাংলাদেশ নৌবাহিনীও উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে অংশ নেয়। সংকটের এই সময়ে সমন্বিত উদ্যোগ ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে তাৎক্ষণিক সহায়তা পৌঁছে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) তথ্য অনুযায়ী, টানা ভারি বর্ষণ, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং সমুদ্রের অস্বাভাবিক জোয়ারের কারণে চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। লোহাগাড়া, সাতকানিয়া, চন্দনাইশ ও বাঁশখালী উপজেলায় প্রায় চার লাখ মানুষ বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। পাশাপাশি বোয়ালখালী, হাটহাজারী ও ফটিকছড়িতেও বন্যার পরিস্থিতি গুরুতর আকার ধারণ করে। এই অবস্থায় জরুরি উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম শুরু করা হয়।
জলাবদ্ধতা কিংবা বন্যা শুধু বাড়িঘর ডুবিয়ে দেয় না; এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি স্তরকে বিপর্যস্ত করে। একটি পরিবার যখন রান্না করতে পারে না, বিশুদ্ধ পানি সংগ্রহ করতে পারে না কিংবা অসুস্থ মানুষকে হাসপাতালে নিতে পারে না, তখন দুর্যোগ কেবল প্রাকৃতিক থাকে না—তা মানবিক সংকটে রূপ নেয়। শিশুদের পুষ্টি, প্রবীণদের স্বাস্থ্য এবং গর্ভবতী নারীদের নিরাপত্তা তখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হয়ে দাঁড়ায়।
এমন পরিস্থিতিতে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের অনুরোধে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১০ পদাতিক ডিভিশন ও ২৪ পদাতিক ডিভিশন দুর্গত এলাকায় উদ্ধারকারী দল মোতায়েন করে। দুর্গম এলাকায় নৌযান, উদ্ধার সরঞ্জাম এবং প্রশিক্ষিত সদস্যদের মাধ্যমে মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কাজ পরিচালিত হয়। একই সঙ্গে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম আরও কার্যকরভাবে পরিচালনার জন্য কয়েকটি অস্থায়ী ক্যাম্পও স্থাপন করা হয়।
অন্যদিকে বাংলাদেশ নৌবাহিনী চট্টগ্রামের পতেঙ্গা, বিজয়নগর, আকমল আলী রোড, নিউ মুরিং মাদ্রাসা, নারিকেলতলা এবং নেভি হাসপাতাল গেইট এলাকায় পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে পানিবন্দি পরিবারগুলোর মধ্যে রান্না করা খাবার বিতরণ করে।
আইএসপিআরের তথ্য অনুযায়ী, দুই হাজার প্যাকেট খাবার ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয় এবং স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরে না আসা পর্যন্ত সহায়তা কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার কথা জানানো হয়।
এই ধরনের কার্যক্রম দুর্যোগের প্রথম ধাপে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বন্যার শুরুতে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয় নিরাপদ আশ্রয়, খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, প্রাথমিক চিকিৎসা এবং দ্রুত উদ্ধার। প্রশিক্ষিত উদ্ধারকারী দল, নৌযান ও সমন্বিত কমান্ড কাঠামো থাকার কারণে সশস্ত্র বাহিনী অনেক ক্ষেত্রে দ্রুত সাড়া দিতে সক্ষম হয়।
তবে দুর্যোগ মোকাবিলার সাফল্য কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করে না। স্থানীয় প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ, স্বাস্থ্যকর্মী, রেড ক্রিসেন্ট, বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই একটি কার্যকর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করে। অনেক এলাকায় স্থানীয় জেলেরা নিজেদের নৌকা নিয়ে উদ্ধারকাজে অংশ নিয়েছেন, তরুণ স্বেচ্ছাসেবকেরা শুকনো খাবার ও ওষুধ পৌঁছে দিয়েছেন। এই সামাজিক সংহতিই বাংলাদেশের অন্যতম বড় শক্তি।
পার্বত্য চট্টগ্রামে পরিস্থিতি আরও জটিল ছিল। সেখানে বন্যার পাশাপাশি পাহাড়ধসের ঝুঁকি দেখা দেয় এবং বিভিন্ন স্থানে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ফলে দুর্গত মানুষের কাছে পৌঁছানো কঠিন হয়ে যায়। এই অবস্থায় যোগাযোগ পুনরুদ্ধার এবং জরুরি সহায়তা পৌঁছে দেওয়া ছিল সময়ের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়; এটি বর্তমান বাস্তবতা। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে এখন আরও ঘন ঘন চরম আবহাওয়ার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। অতিবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা এবং সমুদ্রের অস্বাভাবিক জোয়ার ভবিষ্যতেও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে। তাই দুর্যোগ-পরবর্তী উদ্ধার কার্যক্রমের পাশাপাশি আগাম প্রস্তুতি, ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং টেকসই অবকাঠামো নির্মাণ সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
একটি আধুনিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থায় আগাম সতর্কবার্তা, ডিজিটাল তথ্য বিনিময়, নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র, পর্যাপ্ত উদ্ধার সরঞ্জাম, প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ অপরিহার্য। একই সঙ্গে নদী ব্যবস্থাপনা, জলাবদ্ধতা নিরসন, পাহাড় সংরক্ষণ এবং পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন না হলে দুর্যোগের পুনরাবৃত্তি কমানো কঠিন হবে।
দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসনও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ঘরবাড়ি পুনর্নির্মাণ, কৃষকদের বীজ ও কৃষি উপকরণ সরবরাহ, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পুনরায় ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সচল করা এবং নিরাপদ পানি ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা ছাড়া পূর্ণাঙ্গ পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়।
বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা বলে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় মানুষের মধ্যে এক ধরনের সামাজিক সংহতি তৈরি হয়। প্রতিবেশী প্রতিবেশীর পাশে দাঁড়ায়, স্বেচ্ছাসেবকেরা নিজেদের ঝুঁকি নিয়ে উদ্ধারকাজে অংশ নেয় এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সমন্বিতভাবে কাজ করে। এই সম্মিলিত চেতনাই দুর্যোগ মোকাবিলার সবচেয়ে বড় শক্তি।
সাম্প্রতিক বন্যা আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে যে, দুর্যোগ মোকাবিলায় দ্রুত সিদ্ধান্ত, সমন্বিত উদ্যোগ এবং মানবিক দায়বদ্ধতার কোনো বিকল্প নেই। উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু অভিযোজন, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং দুর্যোগ-সহনশীল পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে ভবিষ্যতের ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
পরিশেষে বলা যায়,প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের লড়াই হয়তো চলবেই। কিন্তু সেই লড়াইয়ে মানুষের পাশে মানুষ, রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগই একটি জাতির প্রকৃত শক্তির পরিচয় বহন করে। বন্যার উত্তাল পানির মাঝেও যে সহমর্মিতা, সহযোগিতা ও দায়িত্ববোধের পরিচয় বিভিন্ন পক্ষ থেকে দেখা গেছে, সেটিই বাংলাদেশের দুর্যোগ মোকাবিলার সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক দিক। ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এই সমন্বিত মানবিক চেতনা আরও শক্তিশালী হোক—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।
ই-মেইল: [email protected]