ঢাকা | মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬ ইং | ২৮ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অশনি সংকেতের পূর্বাভাস

author
শাহীন রাজা

প্রকাশিত : ১৫ জুলাই, ২০২৬ বিকেল ৪:২২
ad003
শেখ হাসিনা আসবেন! শেখ হাসিনা আসছেন! শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে দেশে ফিরবেন! এই নিয়ে দেশে চলছে, সাতকাহন। কেউ উচ্ছ্বসিত। কেউ আবার আতঙ্কিত। উচ্ছ্বসিত হচ্ছে তারাই, শেখ হাসিনা দেশ থেকে বিতাড়িত হওয়ার সব থেকে যারা উল্লাসে মেতে উঠেছিল। তারা ভাবছে, শেখ হাসিনার ফেরা নিয়ে দেশে একটা বড় নৈরাজ্য দেখা দেবে এবং এই নৈরাজ্যের ঘোলা জলে মাছ শিকার করার সম্ভাবনা রয়েছে। ২০২৬ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থান পরবর্তীতে যা তাদের পক্ষে করা সম্ভব হয়নি। 

আর আতঙ্কিত হয়ে উঠেছে, আওয়ামী রাজনীতির মাঠ পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা। ৫ আগস্ট পরবর্তী যে সমস্যায় পড়েছিল তা থেকে অনেকটাই কাটিয়ে উঠেছে। শেখ হাসিনা ফেরা নিয়ে আবার কোন ঝামেলা শুরু হতে যাচ্ছে। এই নিয়ে তৃণমূল নেতা-কর্মীরা বেশ শঙ্কিত। 

বর্তমানে শেখ হাসিনার দেশে ফেরা নিয়ে চলছে বিভিন্ন উপকথা। যে যার মতো করে বলে বেড়াচ্ছে। আমার আমেরিকান প্রবাসী বন্ধু ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছে, ‘যাদের রঙ বদলাতে হবে,  তারা প্রস্তুত হও’। অথচ আমার এই বন্ধু ১২ ফেব্রুয়ারি ইলেকশনের আগের দিন আশাবাদী ছিলেন, আওয়ামী লীগের বিপরীত মেরুর দল ক্ষমতায় আসছে। বিজ্ঞানের ছাত্র হওয়ায় বিভিন্ন সমীকরণ দিয়ে বন্ধু আমায় বুঝাতে চেয়েছেন। বন্ধু আমার হয়তো জানেন না, রাজনীতির পাটিগণিতে কখনো দুইয়ে, দুইয়ে মিলে চার হয় না। হয় তিন হবে, না হয় হবে পাচ! এই ক্ষেত্রেও তিন বা পাচ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

এই সব কাহিনীর মূল হচ্ছে, প্রধান মন্ত্রী তারেক রহমানের চায়না সফর। দেশের ভেতরের কোনো গোষ্ঠী। কিংবা বাইরে কোনো কোনো দেশের কাছে প্রধান মন্ত্রী তারেক রহমানের চায়না সফর তাদের কাছে পছন্দ হয়নি। তা-ই তারা শেখ হাসিনার দেশে ফেরার কাহিনী প্রচার করছে। তাই তারা তথ্য প্রচারের বিভিন্ন মাধ্যমে তা প্রচার করছে। যাতে বর্তমান সরকার বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে যায়। 

শেখ হাসিনার বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা প্রসঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান মুখ্য মন্ত্রী ও বিধায়ক শুভেন্দু অধিকারী বক্তব্য রেখেছেন। তিনি মন্তব্য করেছেন, শেখ হাসিনা বাংলাদেশের বৈধ প্রধান মন্ত্রী এবং তাকে অন্যায়ভাবে পদচ্যুত করা হয়েছে। তিনি প্রধান মন্ত্রী হিসেবেই স্বদেশে ফিরে যাবেন। এই কথাগুলোই আমাদের বিরোধী দলের নেতা একটু ঘুরিয়ে বলেছেন। তিনি বলেছেন, ‘সংবিধানের মধ্যে যদি গণভোটের প্রভিশন না থাকে, তাহলে ২০২৬ সালেও কোনো ইলেকশন নেই। সংবিধান অনুযায়ী ২০২৬ ইলেকশন হওয়ার কথা নয়। সেই ইলেকশন হওয়ার কথা ২০২৯ সালে।’ দুই জনই ইলেকশন বা সরকারের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

এদিকে ইনডিয়ার সাংবাদিক সুবির ভৌমিক বলেছেন ভিন্ন এক কথা। তিনি বলেছেন,  ‘শেখ হাসিনা নিজে,  নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশে ফেরার। তবে ইনডিয়া সতর্ক আছে যেন তিনি বেনজির ভুট্টোর মতোন নিহত না হন।’ কি এক ভয়ংকর কথা! ষড়যন্ত্র কতটা  গভীরে প্রোথিত। অনেকটা এক ঢিলে দুই পাখি মারা। তার কথায় আরেকটি বিষয় প্রকাশ পেয়েছে, শেখ হাসিনা নিজ ইচ্ছায় দেশে ফিরতে চাইছেন। এতে ইনডিয়া সরকারের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। কথিত আছে সুবির ভৌমিক ওই দেশের সংস্থার হয়ে কাজ করে। 

তিব্বতের নির্বাসিত ধর্মীয় নেতা দালাই লামাকে নিয়েও একই ধরনের রাজনীতি করা হয়েছে। দালাই লামার নির্বাসন জীবন এবং তিব্বতের স্বাধীনতা আন্দোলন বিশ্বব্যাপী মনোযোগ আকর্ষণ করার জন্য একই কাজ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিশ্বের কাছে  চায়নার ভাবমূর্তি বিনষ্ট করতে দালাই লামাকে ব্যবহার করা হয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ যাতে চায়নার দিকে বেশি ঝুকে না যায় তার জন্য শেখ হাসিনাকে ব্যবহার করা হচ্ছে। বাংলাদেশের জন্য বর্তমান বাস্তবতা হচ্ছে  আর্থিক সহযোগিতা লাভ এবং এই মুহূর্তে চায়নাই হচ্ছে একমাত্র দেশ যে বাংলাদেশকে এই সহযোগিতা দিতে পারে। এই একমাত্র কারণে চায়নার বন্ধুত্ব বাংলাদেশের জন্য খুবই জরুরি। এটা কাছের এবং দূরের দেশের অনেকের পছন্দ নয়। 

চায়নার সঙ্গে সখ্যতা গড়ে উঠুক তা আটলান্টিক পারের দেশটির পছন্দ নয়। তাই তাদের স্থানীয় বন্ধুদের দ্বারা এখানে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে চায়। এই জন্য দেশে ছোটখাটো ইসু বড় রূপ দিতে চেষ্টা চলছে। চলছে উস্কানিমূলক বক্তব্য। যাতে যে কোনো সময় যে কোনো বড় ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়। শেখ হাসিনার দেশে ফেরার কথা শোনার পর আটলান্টিক পারের স্থানীয় বন্ধুরা আরো আগ্রাসী হয়ে উঠেছে।

আধুনিক রাষ্ট্র বিজ্ঞানীরা বলেন, কোনো দেশ বা সরকারের বিরুদ্ধে কিভাবে নৈরাজ্য সৃষ্টি করা হয়। তার মধ্যে প্রথমেই হচ্ছে, ধর্ম, বর্ণ বা রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিত্তিতে মানুষের মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি করে। এই বিভাজন দেশকে নৈরাজ্যের পথে ধাবিত করে। মিথ্যা তথ্য ও গুজব ছড়ানো, সোশাল মিডিয়া বা অন্যান্য প্রচার মাধ্যমের সাহায্যে ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে দিয়ে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ও অবিশ্বাস তৈরি করা হয়। বর্তমানে বহু সোশাল মিডিয়ার কাজই হচ্ছে, মিথ্যা তথ্য প্রচার করে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করা। অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলত, কালোবাজারি, মজুতদারি বা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে পঙ্গু করে দেয়ার চেষ্টা এবং আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, অপরাধীদের মদদ দিয়ে ও রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে দুর্বল করে দিয়ে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করা। বর্তমানে এর অনেকটাই আমাদের চোখে পড়ছে। বিশেষ করে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার সংবাদ প্রচারের মধ্য দিয়ে এটা আরো ত্বরান্বিত করার প্রয়াস।

আওয়ামী লীগ একটা বড় রাজনৈতিক দল। রাজনৈতিক আচার-আচরণের মধ্য দিয়ে তাকে রাজনীতিতে ফিরে আসতে হেেব। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ বিনয় পছন্দ করে। আগ্রাসী কর্মকাণ্ড ব সন্ত্রাসী আচরণ পছন্দ করে না। দীর্ঘ সময়ের একটি রাজনৈতিক দল, আশা করি বিষয়টি সম্পর্কে তারা সম্যক অবহিত। কিংবা আওয়ামী লীগ কোনো বিপ্লবী দল নয়। তারা নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল। বর্তমানেও তাদের রাজনৈতিক পরিভাষা এমনটাই আশা করছে জনগণ। 

এদিকে হঠাৎ করে শেখ হাসিনার দেশে আসার খবর বাংলাদেশের সামাজিক এবং সংবাদ মাধ্যমে ফলাও করে প্রচার করা হয়। সংবাদে বলা হয়, শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফিরবেন। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সে দেয়া এক সাক্ষাৎকােের শেখ হাসিনা স্বয়ং এ কথা জানিয়েছেন। কিন্তু আমাদের সামাজিক এবং সংবাদ মাধ্যমে প্রচারের ব্যাপারে আদালতের নির্দেশনা রয়েছে।  

শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচারে আদালতের একটি আদেশ বহাল আছে। ২০২৪ সালের ৫ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল (আইসিটি) শেখ হাসিনার বক্তব্য ও ভাষণ প্রচারের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। ‘বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী, কোনো আদালতের সাজাপ্রাপ্ত পলাতক অপরাধীর বক্তব্য বা বিবৃতি গণমাধ্যমে প্রচার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। সরকারি নির্দেশনা হচ্ছে, আদালতের এই নির্দেশনার প্রতি সম্মান জানিয়ে এবং দেশের আইন শৃঙ্খলার স্বার্থে পৃন্ট, ইলেকট্রনিক, অনলাইন ও সোশাল মিডিয়াকে তার কোনো প্রকার বক্তব্য প্রচার না করার জন্য সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে বিশেষ অনুরোধ ও সতর্কতা জারি করেছে।’ কিন্তু বাংলাদেশের সামাজিক এবং সংবাদ মাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছে। আদালতের এই আদেশকি এখনো বহাল আছে না তুলে নেয়া হয়েছে? জানা মতে, আদেশটি বোধহয় এখনো বহাল রয়েছে। তাহলে কি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে উদাসীন! 

এখানে ধর্মের মতান্তর বা আদর্শের নামে দেশের সম্ভাবনা অনাদিকাল থেকে থমকে আছে। এখানে জনকল্যাণ নয়, রাষ্ট্র বা সম্পদ দখলের প্রতিযোগিতা প্রতিনিয়ত। এই রাজনীতি আর নয়। এখন থেকে বাংলাদেশকে সম্ভাবনার পথ ধরে হাটতে হবে।

শাহীন রাজা : সিনিয়র সাংবাদিক 
সংবাদটি শেয়ার করুন :
প্রতিবেদকের তথ্য
SH.AL

SH.AL

© স্বত্বাধিকারঃ যায়যায়দিন
কারিগরী সহযোগিতায় MULTISOFT