সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাসে সাধারণত সরকার ও বিরোধী দলের মতপার্থক্যগত বিরোধ থাকে তীব্র। অতীতে প্রতিটি ক্ষেত্রেই একে অপরের অবস্থান ছিল ভিন্ন। কিন্তু ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ লাঘব ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় সরকার ও বিরোধী দল একমত হয়েছে। গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে বিভিন্ন বিষয়ে সমস্যা সমাধানের পথ তৈরি করেছে। প্রমাণিত হয়েছে আলাপ-আলোচনা, তর্কবিতর্কের মধ্য দিয়ে জাতীয় সংসদেই বিভিন্ন বিষয়ে মতবিরোধের সমাধান সম্ভব। সরকার প্রধান ও বিরোধী দলীয় নেতার বক্তব্যেও এক ধরনের সহনশীলতার প্রতিচ্ছবি লক্ষ্য করা গেছে। বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের অনুরোধে তাঁর নির্বাচনী এলাকার উন্নয়নকাজের ‘দেখভাল’ করার দায়িত্ব স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমকে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। আওয়ামী লীগ ও ‘ফ্যাসিবাদ’ প্রশ্নেও তাদের অবস্থান অভিন্ন।
গত দেড় দশকের স্তুতির বদলে গঠনমূলক বিতর্কে ত্রয়োদশ সংসদের দুটি অধিবেশন ছিল উত্তপ্ত, প্রাণবন্ত ও সরগরম। এসব ক্ষেত্রে সংসদ নেতা হিসেবে তারেক রহমানের বিনয়, সহমর্মিতা, মানবিকতা ও শ্রদ্ধাশীল আচরণ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ঠাঁই করে নিয়েছে। সুশৃঙ্খল ও জনকল্যাণমুখী চিন্তা-ভাবনা থেকেই একবার প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন-‘এই সংসদ মানেই পুরো বাংলাদেশ।’ রাষ্ট্রগঠন ও গণতান্ত্রিক প্রাতিষ্ঠানিকীকরণে সরকারি দলের পাশাপাশি বিরোধী দলও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। অতীতের সাজানো একটি ব্যবস্থার প্রতীকী ধারা থেকে ক্রমশ বের হয়ে আসছে সংসদ। মালয়েশিয়া ও চীন সফরে ‘অভূতপূর্ব সাফল্যের’ জন্য প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে প্রস্তাব গ্রহণ করে জাতীয় সংসদ। বিরোধীদলীয় নেতা প্রস্তাবটি সমর্থন করে বক্তব্য দেন। পরে প্রস্তাবটি ভোটে দেন স্পিকার, কণ্ঠভোটে তা পাস হয়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান একটি বিষয় খোলাসা করতে চেয়েছেন। তিনি বুঝাতে চেয়েছেন মত, পথ ও আদর্শের ভিন্নতা থাকতে পারে, অবস্থানে ভিন্নতা থাকতে পারে; কিন্তু দেশ, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে সবাই এক। সবার আগে বাংলাদেশ। বুধবার (১৫ জুলাই) জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যেও প্রধানমন্ত্রী অনড় তাঁর আগের অবস্থানে। বিরোধী দলকে সরকার শত্রু হিসেবে ভাবছে না। বাংলাদেশ যেন আর কখনো ফ্যাসিবাদের কবলে না পড়ে এবং তাঁবেদারি রাষ্ট্রে পরিণত না হয়, সেজন্য জাতীয় ঐক্য বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন সংসদ নেতা। তিনি বলেছেন, সংসদে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে মতভিন্নতা থাকলেও কোনো শত্রুতা থাকবে না। প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের পরিবর্তে দেশে ন্যায়পরায়ণতা প্রতিষ্ঠিত হবে।’
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনেও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় একটি সর্বদলীয় সংসদীয় কমিটি গঠনের মাধ্যমে সরকারি দল এবং বিরোধী দলের সমান সংখ্যক সদস্য রাখার প্রস্তাব ও ১০ সদস্যের কমিটির মধ্যে দিয়ে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে এমন ঘটনা ছিল প্রথম। তিনি জাতীয় সমস্যা সমাধানে সংসদকে কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে রূপান্তরিত করেন। অস্থিতিশীলতা নয় জাতীয় ঐক্যই যেকোন সংকট সমাধানে হতে পারে প্রধান হাতিয়ার। সংসদের প্রথম অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে সংসদ নেতা বলতে দ্বিধা করেননি-‘আপনারা (বিরোধী দল) ব্যর্থ হওয়া মানেই আমি ব্যর্থ হওয়া, আর আমাদের কেউ একজন ব্যর্থ হলে পুরো বাংলাদেশ ব্যর্থ হয়ে যাবে।’ সহনশীলতার চর্চা জারির মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেছেন বুক তাঁর বাংলাদেশের হৃদয়।
সংসদের বাজেট অধিবেশনের সমাপনী দিনেও বুধবার (১৫ জুলাই) সরকারপ্রধান স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘প্রিয় মাতৃভূমি আর যাতে তাঁবেদারি রাষ্ট্রে পরিণত না হয়-সেই প্রশ্নে সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে জাতীয় ঐক্য অটুট থাকবে।’ মূল্যবোধ পুনরুদ্ধারের ওপর গুরুত্ব দিয়ে একটি বিখ্যাত ছড়া উদ্ধৃত করে তিনি বলেছেন, ‘সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি, সারাদিন আমি যেন ভালো হয়ে চলি’-আমাদের এই ছোটবেলার মূল্যবোধকে যেকোনো মূল্যে এই সংসদে ফিরিয়ে আনতে হবে। আমরা যদি এই দেশকে গঠন করতে চাই, তবে এই সকল মূল্যবোধ ফিরিয়ে আনা অপরিহার্য।’
এমন এক সময়ে পুনরায় জাতীয় ঐক্যের ডাক দিলেন সরকারপ্রধান যখন তাঁর সরকারের শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের ঘরোয়া ও অনানুষ্ঠানিক একটি বক্তব্যকে ঘিরে রাজধানীতে এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। অথচ সরকার এইচএসসি পরীক্ষার্থীবান্ধব একাধিক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। শিক্ষামন্ত্রী সংসদে দাঁড়িয়ে এই বক্তব্যের জন্য দু:খ প্রকাশ করেছেন। ভুল প্রশ্নে ক্ষতিগ্রস্ত পরীক্ষার্থীদের পূর্ণ নম্বর দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন মন্ত্রী। ভুল প্রশ্ন প্রণয়নে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। বৈরী আবহাওয়ায় যারা পরীক্ষা দিতে পারেননি তাদের আবারও পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দিয়েছেন। কোন রকম যৌক্তিকতা না থাকলেও মাত্র চার মাস বয়সী একটি সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে শিক্ষার্থীদের চলমান আন্দোলনে সুকৌশলে তৃতীয় পক্ষ প্রবেশ করেছে। তাঁরা রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের অপচেষ্টায় লিপ্ত। সরকার পুরো পরিস্থিতি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে। প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় ঐক্যের ডাক তাই বর্তমান বাস্তবতায় অত্যন্ত সময়োপযোগী ও যৌক্তিক বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।
আদর্শ সংসদীয় ব্যবস্থায় বিরোধী দলকে ‘গভর্নমেন্ট ইন ওয়েটিং’ ভাবা হয়। দেশের প্রয়োজনে ও জাতির স্বার্থে নানা কারণেই সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে সুসংহত জাতীয় ঐক্য জরুরি। সরকারি দলের জনগণের প্রতি জবাবদিহির একটি সর্বোচ্চ মঞ্চ হলো সংসদ। আর সেই সংসদের দুই অবিচ্ছেদ্য এবং প্রয়োজনীয় অংশীজন সরকার ও কার্যকর বিরোধী দল। দু'পক্ষের এমন দ্বান্দ্বিকতার মধ্য দিয়েই সংসদ একটি কার্যকর ব্যবস্থায় রূপান্তরিত হতে পারে। যেখানে জনগণের কাছে জবাবদিহি নিশ্চিত হবে এবং জনগণের প্রতিনিধিদের যথাযথ অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে জনগণের কণ্ঠ সংসদে প্রতিধ্বনিত হবে।
বিভিন্ন দেশীয় অপশক্তি এবং বিদেশি আধিপত্যবাদী ষড়যন্ত্রকারীরা আগে থেকেই দেশে এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি তৈরির খোয়াব দেখছে। জাতিগতভাবে অস্তিত্ব রক্ষার বিষয়টি এখন অত্যন্ত জরুরি হয়ে ঠেকেছে। এই ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ অবস্থায় বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের কোন বিকল্প নেই। এমন পরিস্থিতিতে সরকারের সঙ্গে দেশের সব দেশপ্রেমিক গণতান্ত্রিক দলের সম্মিলিতভাবে একটি জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। সবার সম্মিলিত প্রয়াসেই দেশি-বিদেশি সব অপশক্তি বা স্বার্থান্বেষী মহলকে রুখে দিতে হবে।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, জাতীয় ঐক্য যেন কোনভাবেই রাজনৈতিক স্বার্থের কাছে পরাজিত না হয়। মতবিরোধের রাজনীতি তীব্রতর করার আর সুযোগ নেই। জাতীয় ঐক্যের প্রকৃত রূপায়ণের জন্য কয়েকটি মৌলিক পদক্ষেপের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন বিশ্লেষকরা। তাঁরা বলছেন, প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর নিজেদের আস্থা-বিশ্বাস গড়ে তুলতে হবে। সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে জাতীয় ঐক্যের অংশ হতে হবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি অনন্য উদাহরণ তৈরি করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এক্ষেত্রে আন্তরিক। উদারনৈতিক গণতন্ত্রের রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় তিনি বিশ্বাস করেন ‘এগ্রি টু ডিসএগ্রি’ বা ভিন্নমতে একমত নীতিতে। এদেশের মানুষও আর কোন অবস্থাতেই পুরনো ব্যবস্থায় ফিরে যেতে চায় না। তাঁরা পরিবর্তনে বিশ্বাস করতে শুরু করেছে। কোন রকম বড় বিভক্তি বা বিভাজন যেন তৈরি না হয় সেদিকে সবার সচেতন থাকা জরুরি কর্তব্য। মনে রাখতে হবে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে একমাত্র নিয়ম হিসেবে দেখার ও মানার প্রবণতা তৈরি হলেই টেকসই হবে গণতান্ত্রিক চর্চা। দেশের স্থিতিশীলতার জন্য সবাইকেই ছাড় দেওয়ার মানসিকতা দেখাতে হবে।
লেখক : সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
[email protected]