ঢাকা | সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬ ইং | ২৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অনেকদিন থাকি শুনা যায়ছে এঠে ব্রীজ হইবে

author
স্টাফ রিপোর্টার, নীলফামারী

প্রকাশিত : ১৭ জুলাই, ২০২৬ দুপুর ২:০৫
ad003

‘অনেকদিন থাকি শুনা যায়ছে এঠে ব্রীজ হইবে। কিন্তু ব্রীজের কুনো নমুনা দেখা যায়ছে না।‘কথাগুলো এভাবে বললেন, দিনাজপুর জেলার খানসামা উপজেলার আলোকঝারী ইউনিয়নের জয়গঞ্জ গ্রামের বাসীন্দা মো. সহিদুল ইসলাম (৫৫)। ঝারবাড়ি হাট থেকে বাড়ি ফেরার সময় নৌকার জন্য অপেক্ষা করছিলেন তিনি। এসময় কথা বললে এভাবেই কথাগুলো বলেন তিনি। তিনি আরো বলেন, ‘ নৌকাত পার হইতে আধা ঘণ্টার বেশি দাড়ে থাকির নাগেছে। আর ব্রীজ থাকিলে তো দুই মিনিটও নাইগবে না।’

দিনাজপুর জেলার খানসামা উপজেলার জয়গঞ্জ ও ঠাকুরগাঁও জেলার বীরগঞ্জ উপজেলার ঝাড়বাড়িকে আলাদা করেছে আত্রাই নদী। দীঘদিন ধরে এ নদীর ওপর একটি সেতুর দাবী জানিয়ে আসছেন ওই এলাকার বাসিন্দারা। সেতুটি নির্মিত হলে ওই এলাকার মানুষ যেমন উপকৃত হবেন। তেমনি নীলফামারী জেলার সঙ্গে দূরত্ব কমবে ঠাকুরগাঁও জেলা শহরের। এ পথে ঠাকুরগাঁও জেলার সঙ্গে বিভাগীয় শহর রংপুর ও রাজধানী ঢাকার দূরত্ব কমবে অনেকাংশে।

সেতুটির গুরুত্ব তুলে ধরে সেখানে সেতু নির্মানের দাবী জানিয়ে সংসদে বক্তব্য দিয়েছেন নীলফামারী-২ সদর আসনের সংসদ সদস্য ও চিরিরবন্দর-খানসামা আসনের সংসদ সদস্য ও সংসদের হুইপ আক্তারুজ্জামান মিয়া।(নীলফামারী-২ আসনের সংসদ সদস্য ৮জুন এবং হুইপ আক্তারুজ্জামান মিয়া ২৯ মার্চ এবং ২৬ জুন সংসদে বক্তব্য দেন।)

দিনাজপুর জেলার খানসামা উপজেলার আলোকঝাড়ি গ্রামের পবিত্র দেবনাথ (৩৫) বলেন, ‘আত্রাই নদীর পশ্চিমে ঠাকুরগাও জেলার বীরগঞ্জ উপজেলার ঝাড়বাড়ি এবং পূর্বে দিনাজপুর জেলার খানসামা উপজেলার জয়গঞ্জের অবস্থান। আমাদের বাড়ি খানসামা উপজেলার জয়গঞ্জ গ্রামে। উপজেলা সদরসহ দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড় যাতায়াতে আমাদের প্রধান বাধা আত্রাই নদীটি। জরুরী প্রয়োজনে আমাদের জীবনের ঝুকি নিয়ে সময় অপচয় করে নৌকায় যাতায়াত করতে হচ্ছে। এখানে একটি সেতু হলে ব্যবসা বানিজ্যসহ সকল সুবিধা পাবেন এ অঞ্চলের মানুষ।’

ঠাকুরগাঁও জেলার গড়েয়া হাট এলাকার হরেন্দ্র নাথ সেন (৫০) বলেন, ‘আমরা ঠাকুরগাঁও জেলার মানুষ হলেও আমাদর নিত্য প্রয়োজনে নীলফামারী জেলায় যাতায়াত করতে হয়। নদী পার হয়ে গেলে রাস্তা কম হয়। কিন্তু সময় ও খরচ অপচয় হয় বেশি। অনেকদিন ধরে শুনছি এখানে সেতু হবে। কিন্তু সেতু আর হয় না।’তিনি বলেন, ‘সেতুটি নির্মাণ হলে ঠাকুরগাঁও থেকে নীলফামারী হয়ে বিভাগীয় শহর রংপুর ও রাজধানী ঢাকার দূরত্ব কমবে অন্তত ৪৫ কিলোমিটার।’

নীলফামারী সড়ক ও জনপথ বিভাগ সুত্র মতে, ঠাকরগাঁও সদর থেকে সৈয়দপুর হয়ে নীলফামারীর দূরত্ব ৮৫ কিলোমিটার। আবার ঠাকুরগাঁও সদর থেকে দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলার ঝাড়বাড়ি ও খানসামা উপজেলার জয়গঞ্জ হয়ে নীলফামারীর দূরত্ব ৪২ কিলোমিটার। আত্রাই নদীর ওপর ৬৫০ মিটার একটি সেতুই এখন কমাতে পারে ওই দূরত্ব।

সম্প্রতি ঝাড়বাড়ি ও জয়গঞ্জ এলাকায় গিয়ে দেখা যায় নদী পারাপারে নৌকার জন্য অপেক্ষা করছেন অসংখ্য নারী পুরুষ শিশু। ভ্যান-রিক্সা, মোটরসাইকেল, বাইসাইকেল, ইজিবাইক আবার কেউ কেউ পায়ে হেটে আসছেন নৌকা ঘাটে। পায়ে হেটে বালু পানি অতিক্রম করে নৌকায় উঠতে হচ্ছে তাদের। অনেককে মোরসাইকেল, বাইসাইকেল ও ভ্যান রিক্সায় মালামালও পরিবহন করতে দেখা গেছে।

ঝাড়বাড়ি এলাকা থেকে বাইসাইকেলের পেছনে সিলভারের বড় পাতিলে পুকুরের মাছ নিয়ে নীলফামারীর ভবানীগঞ্জ বাজারের যাচ্ছিলেন, হরেন্দ্র নাথ রায় (৪০)। তিনি বলেন, ‘পাতিলে পানি দিয়ে জ্যান্ত মাছ বিক্রির জন্য নিয়ে যাচ্ছি। কোনো কারনে নৌকা কাত হলে সামলানো যাবে না। সব মাছ নদীতে চলে যাবে। নদীর দুই দিকে পাকা রাস্তাও আছে। এখানে একটা সেতু হলে আমাদের সব সমস্যার সমাধান হয়।’ ঝাড়বাড়ি-জয়গঞ্জ-খেয়াঘাট সেতু বাস্তায়ন আন্দোলন কমিটির আহ্বায়ক মো. জাকির হোসেন বলেন,‘প্রস্তাবিত এই সেতুটি নীলফামারী সড়ক ও জনপথ বিভাগের অধিনে। ঝাড়বাড়ি-জয়গঞ্জ খেয়া ঘাটে আত্রাই নদীর ওপর একটি সেতুর জন্য আমরা দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন সংগ্রাম করছি। আমাদের আন্দোলন চলমান আছে। সেতু নির্মাণের জন্য এখানে মাটি পরীক্ষা ও জরিপও হয়েছে। সেতুর দুই দিকে রাস্তাও হয়েছে, কিন্তু সেতু আর হয় না। এখানে একটি সেতু নির্মাণের গুরুত্ব তুলে ধরে সংসদেও আলোচনা হচ্ছে।’

তিনি আরো বলেন, নীলফামারী থেকে ঝাড়বাড়ির দূরত্ব ১৭ কিলোমিটার, আর ঝাড়বাড়ি থেকে ঠাকুরগাঁওয়ের দূরত্ব ২৫ কিলোমিটার। অথচ সেতুটির অভাবে ভারী যানবাহন নিয়ে ঠাকুরগাঁও থেকে দিনাজপুরের ১০ মাইল হয়ে নীলফামারীর দূরত্ব ৮৮ কিলোমিটার। সেতুটি হলে এ অঞ্চলের মানুষের যোগাযোগে সময় এবং খরচ দুইটাই কমবে।’

নীলফামারী সড়ক ও জনপথ বিভাগের সহকারী প্রকৌশলী জুয়েলুর রহমান বলেন, ‘সেতুটি নির্মাণ করা গেলে ঠাকুরগাঁও থেকে সোজা পথে নীলফামারী হয়ে রংপুর যাওয়া যাবে। এ জন্য বীরগঞ্জের ঝাড়বাড়ি, খানসামার জয়গঞ্জ হয়ে নীলফামারী সদরের ভবানীগঞ্জ, পুলিশ লাইন্স বাদিয়ার মোড়, পাঁচমাথা পঞ্চপুকুর হয়ে কিশোরগঞ্জ উপজেলার ছাদুরার পুল পর্যন্ত ৩৭ দশমিক ৬২ কিলোমিটার সড়ক রয়েছে। ওই সড়কের ৫কিলোমিটার ছিল সড়ক বিভাগের। বাকি ৩২দশমিক ৬২৫কিলোমিটার ছিল স্থানীয় সরকার (এলজিইডি) বিভাগের। ২০২০ সালে এলজিইডির ওই সড়ক সওজ বিভাগের কাছে হস্তান্তর করে। এর পর আমরা ওই সড়ক প্রসস্তকরণ করি। সড়ক সম্প্রসারণের পাশাপাশি আমরা ওই সড়কে ৪টি সেতু এবং ১৪টি কালভার্টের কাজও সম্পন্ন করেছি।’

নীলফামারী সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সুলতান মাহমুদ বলেন, ‘ সেতুটি নিয়ে সংসদে কথা হচ্ছে, সেতুটি নির্মাণে হাইড্রো-মরফলোজি স্টাডি সম্পন্ন করা হয়েছে। সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য মন্ত্রনালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। ওই নদীতে প্রস্তাবিত জয়গঞ্জ সেতুটির দৈর্ঘ্য হবে  ৬৫০ মিটার। সেতু ও দুই দিকের সংযোগ সড়ক নির্মাণে আনুমানিক ৩০০ কোটি টাকা খরচ হবে।’

তিনি বলেন, ‘ইতি মধ্যে রাস্তা প্রসস্তকরণ চারটি সেতু ১৪টি কালভার্টের কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। সেতুটি নির্মাণ হলে ঠাকুরগাঁও থেকে নীলফামারী-রংপুর ও ঢাকার দূরত্ব কমবে। তাতে করে ওই পথে সময় ও পরিবহণ খরচ অনেকাংশে কমে যাবে।’

এ বিষয়ে নীলফামারী-২ সদর আসনের সংসদ সদস্য আলফারুক আব্দুল লতীফ সেতুটির গুরুত্বের কথা তুলে ধরে বলেন, ‘নীলফামারী জেলা শহরের সঙ্গে অন্য কোনো জেলা শহরের সড়ক কিংবা রেলপথে সরাসরি যোগাযোগ নেই। নীলফামারী জেলা শহরের সঙ্গে সবচেয়ে কাছের জেলা শহর ঠাকুরগাঁও। দুই জেলার দুইদিক থেকে পাকা রাস্তাও আছে। মাঝে শুধু আত্রাই নদীর ওপর সেতুটি নেই। সেতুটি হলে নীলফামারীর সঙ্গে যেমন ঠাকুরগাওয়ের দূরত্ব কমবে। একইভাবে নীলফামারী হয়ে রংপুর ও ঢাকার দূরত্ব কমবে ঠাকুরগাও জেলার।’ তিনি আরো বলেন, ‘সেতুটির গুরুত্ব তুলে ধরে আমি গত ৮ জুন সংসদে বক্তব্যও দিয়েছে। একইভাবে খানসামা-চিরির বন্দর আসনের সংসদ সদস্য ও সংসদের হুইপ আক্তারুজ্জামান মিয়া সেখানে সেতু নির্মাণ দাবী করে সংসদে বক্তব্য দিয়েছেন।’
সংবাদটি শেয়ার করুন :
প্রতিবেদকের তথ্য
SH.AL

SH.AL

© স্বত্বাধিকারঃ যায়যায়দিন
কারিগরী সহযোগিতায় MULTISOFT