টাঙ্গাইলের সখীপুরে তৃতীয় শ্রেণির স্কুলছাত্রী সামিয়া আক্তার (৯) অপহরণ ও হত্যা মামলায় আসামি সাব্বির মিয়াকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। গত ১৫ জুলাই ঘোষিত এ রায়ের মাধ্যমে বিচারিক প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি হলেও, ভুক্তভোগী পরিবারের শোক ও বেদনার শেষ হয়নি। বরং এক বছরের ব্যবধানে একের পর এক মৃত্যুর ঘটনায় পুরো পরিবারটি আজ প্রায় নিঃশেষ হয়ে গেছে।
ঘটনার সূত্রপাত ২০২৩ সালের ৬ সেপ্টেম্বর। সেদিন সকালে দাড়িয়াপুর উত্তর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী সামিয়া প্রাইভেট পড়তে গিয়ে আর বাড়ি ফেরেনি। পরে জানা যায়, ফেরার পথে একই এলাকার আনোয়ার হোসেনের ছেলে সাব্বির মিয়া (২১) তাকে পেছন থেকে মুখ চেপে ধরে পাশের একটি জঙ্গলে নিয়ে যায়। সেখানে সামিয়া আত্মরক্ষার চেষ্টা করলে তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়।
সামিয়া নিখোঁজ হওয়ার পরদিন তার বাবা রনজু মিয়া সখীপুর থানায় মামলা করেন। ৮ সেপ্টেম্বর স্থানীয় একটি ধানক্ষেতের ড্রেন থেকে সামিয়ার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তদন্তে নেমে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় ২৮ সেপ্টেম্বর সাব্বিরকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তীতে তিনি আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেন।
তবে আইনের বিচারে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হলেও, এই পরিবারটির জীবনে নেমে আসে একের পর এক ট্র্যাজেডি। সামিয়ার হত্যার মাত্র ১৫ দিনের মাথায় মারা যায় তার চার মাস বয়সী ছোট ভাই রিদুয়ান। এরপর সন্তান হারানোর শোক সহ্য করতে না পেরে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন মা রূপা আক্তার (২৮)। দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর ঘটনার প্রায় এক বছর পর তিনিও মারা যান। স্থানীয়দের ভাষ্য, মেয়ের মৃত্যুর শোক তিনি কোনোদিনই কাটিয়ে উঠতে পারেননি।
বর্তমানে দাড়িয়াপুরে সামিয়াদের বাড়িটি জনশূন্য, মূল দরজায় ঝুলছে তালা। বাড়ির আঙিনায় এখনও রয়েছে আমগাছ, হাঁস-মুরগি ও পরিবারের অসংখ্য স্মৃতি। কিন্তু প্রিয়জনদের অনুপস্থিতিতে সেই বাড়ি এখন নীরবতার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি বাবা রনজু মিয়া জীবিকার তাগিদে প্রবাসে রয়েছেন। প্রবাসে থেকেই তিনি স্ত্রীর মারা যাওয়া ও মামলার রায়ের খবর পেয়েছেন।
এদিকে, পরিবারের বাকি দুই শিশু—সিনহা (৮) ও রুজাইন (৫)—এখন তাদের নানী সেলিনা বেগমের কাছে থাকছেন। মাঝে মাঝে তারা তাদের ফেলে আসা শূন্য বাড়িতে ফিরে আসে, আর কান্নায় ভেঙে পড়ে। শিশু দুটির চোখে-মুখে ভেসে ওঠে অব্যক্ত বেদনার ছাপ।
আদালতের রায়ে অপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত হলেও, একটি পরিবারের ওপর নেমে আসা এই মর্মান্তিক মানবিক বিপর্যয়ের ক্ষত কোনো রায়েই পূরণ হওয়ার নয়।
আসামি সাব্বিরকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। আইনের খাতায় হয়তো 'ন্যায়বিচার' শব্দটা টিক চিহ্ন পেয়েছে, কিন্তু সামিয়ার পরিবারের জন্য এই রায় যেন এক মহাশূন্যতার মাঝে দাঁড়িয়ে কান্নার প্রতিধ্বনি মাত্র। কারণ, এই একটি হত্যাকাণ্ড শুধু সামিয়াকে কেড়ে নেয়নি, তাসের ঘরের মতো গুঁড়িয়ে দিয়েছে আস্ত একটি সাজানো সংসার।