ঢাকা | সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬ ইং | ২৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সেবকের মানসিকতা গড়তে প্রয়োজন মনস্তাত্ত্বিক রুপান্তর

author
এ ইউ দৌলা

প্রকাশিত : ২২ জুলাই, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:০৭
ad003
সম্প্রতি প্রচারিত রাষ্ট্র কর্তৃক সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জনগণের সেবক হিসেবে নিজেদের নিয়োজিত করার নির্দেশ, উপদেশ ও অনুরোধ আমাদের প্রশাসনিক সংস্কৃতির একটি মস্তবড় ক্ষত স্থানকে সরাসরি চিহ্নিত করেছে।

তবে নিশ্চিতভাবেই যুগ যুগ ধরে চলে আসা ঔপনিবেশিক মানসিকতা ভেঙে জনপ্রশাসনের কর্মচারীদের জনগণের প্রকৃত সেবক হিসেবে গড়ে তোলার ঘোষণা অত্যন্ত সময়োপযোগী ও জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন।

কিন্তু অত্যন্ত যৌক্তিকভাবেই একটি প্রশ্ন সামনে চলে আসে: কেন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এই নির্দেশ,আদেশ বা উপদেশ পালন করবেন? আইনের বইয়ে তো কত শত ধারা ও উপধারা লেখা রয়েছে,কেন সেটা যথেষ্ট মনে হচ্ছে না? আসলে এই নির্দেশ নিজেই এই নির্মম সত্যটি স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, সরকারি চেয়ারগুলোতে যারা বসে আছেন, তারা নিজেদের জনগণের সেবক হিসেবে ভাবতে এখনো যথেষ্ট দুর্বল। 

এখন প্রশ্ন হলো, একটি সরকারি আদেশে কি রাতারাতি সব বদলে যায়? এই নির্দেশ মেনে কি প্রশাসন যন্ত্রের সবাই রাতারাতি সেবকের মানসিকতা গ্রহণ করে নেবেন? উত্তরটি নির্দ্বিধায় ‘না’। আইন দিয়ে কখনো মানুষের মনস্তত্ত্বও শাসন করা যায় না। মানুষের প্রতিটি ভালো কিংবা মন্দ আচরণের পেছনে থাকে বহু দশকের দীর্ঘ লিগ্যাসি বা ঐতিহ্য। মন্দ লিগ্যাসিগুলো যেন জাতিসত্তার অভিশাপ, তাই সেই সংস্কৃতি রাতারাতি মুছে ফেলা অসম্ভব। তাহলে পথ কি? কীভাবে সেই অভিশাপ থেকে মুক্তি সম্ভব?

আমাদের প্রশাসনিক ব্যবস্থার শেকড় প্রোথিত রয়েছে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের আমলে। ব্রিটিশরা এ দেশে শাসন ও শোষণ টিকিয়ে রাখার জন্য যে শাসনযন্ত্র তৈরি করেছিল, তার মূল উদ্দেশ্য ছিল জনকল্যাণ নয়, বরং জনগণের ওপর দমন পীড়ন চালানো এবং কর আদায় নিশ্চিত করা। সেই আমলে সরকারি কর্মকর্তারা ছিলেন এক কথায় ‘মালিক’ বা ‘কর্তা’। সাধারণ মানুষ তাঁদের দেখত এক ভীতিকর শক্তির প্রতীক হিসেবে, যাদের সামনে দাঁড়ানোও ছিল একপ্রকার দুঃসাহস।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর অর্ধশতাব্দী পার হয়ে গেছে, রাষ্ট্রের রাজনৈতিক কাঠামো বদলেছে, সংবিধান অনুযায়ী প্রজাতন্ত্রের সব ক্ষমতার মালিক হয়েছে জনগণ; কিন্তু অদ্ভুতভাবে সেই ঔপনিবেশিক মনস্তত্ত্বের মৌলিক কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। আজও সরকারি দপ্তরে সাধারণ মানুষেরা যে আচরণের মুখোমুখি হন, তা অনেক ক্ষেত্রেই একজন শাসকের আচরণের কথাই মনে করিয়ে দেয়। ফাইলের স্তূপ, দীর্ঘসূত্রিতা, সাধারণ মানুষকে ছোট করা এবং নিজেদের বিশেষ মর্যাদাপন্ন প্রজাতিভাবার এই যে মানসিকতা, তা একদিনে তৈরি হয়নি। তবে এটি কারো ব্যক্তিগত দোষ নয় বরং দশকের পর দশক ধরে চলা এক অভ্যস্ত লিগ্যাসি।

আইনপ্রণয়ন করা সহজ, কিন্তু মানুষের মানসিকতা পরিবর্তন করা অত্যন্ত দুরূহ কাজ। সমাজ বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, মানুষের আচরণ প্রধানত নিয়ন্ত্রিত হয় তার পরিবেশ, মূল্যবোধ, সামাজিক স্বীকৃতি এবং নিজস্ব মনস্তত্ত্ব দ্বারা।

যদি কোনো সংস্কৃতিতে দুর্নীতির চর্চা স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়ায়, তবে সেখানে সততার আইন, জ্ঞান বিতরণ কিংবা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান থাকলে ও তা দুর্নীতিকে রুখতে পারে না। সরকারি চাকরিতে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য ভিজিল্যান্স কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, শৃঙ্খলা ও আপিল বিধিমালা, সবই রয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও কেন অনিয়ম ও জনদুর্ভোগ বন্ধ হয় না? কারণ, আইনের কঠোরতা দিয়ে বাহ্যিক অপরাধ হয়তো কিছু মাত্রায় ঠেকানো যায়, কিন্তু মানুষের ভেতরের নৈতিক অবস্থান বদলানো যায় না।

একজন সরকারি কর্মকর্তা যখন দেখেন যে, তার আশপাশের অনেকেই অনিয়মের মধ্য দিয়েও পুরস্কৃত হচ্ছেন কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার করে পার পেয়ে যাচ্ছেন, তখন একটি উপদেশ বা নির্দেশতাকে নৈতিকভাবে খুব বেশি নাড়া দিতে পারে না। তিনি হয়তো সাময়িকভাবে ফাইল সচলের গতি কিছুটা বাড়াবেন কিংবা মুখের ভাষা একটু নরম করবেন, কিন্তু তার ভেতরের ‘মালিকানা ফ্লেভার’ বা কর্তার অহংকার অবিকল থেকে যাবে। আইন মানুষের বাহ্যিক আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, কিন্তু মানুষের অন্তরের তাগিদ তৈরি করতে পারে না। অন্তরের তাগিদ তৈরি করতে হলে প্রয়োজন মনস্তাত্ত্বিক বিপ্লবের।

মানুষ তখনই কোনো ভালো কাজ নিজ থেকে করতে উদ্বুদ্ধ হয়, যখন সেই কাজের সাথে তার নিজের আত্মসম্মান, মর্যাদা এবং অহংকার জড়িত থাকে। কাউকে জোর করে বা শাস্তির ভয় দেখিয়ে দীর্ঘমেয়াদে ভালো কাজ করানো যায় না। ভয় মানুষকে সাময়িকভাবে বাধ্য করতে পারে, কিন্তু তা সততা এবং স্বতঃস্ফূর্ত সেবা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়।জনগণের সেবক হওয়ার বিষয়টি যখন কেবল একটি ‘নির্দেশ’ হিসেবে দেখা হয়, তখন সেটি কর্মচারীদের কাছে একটি মানসিক চাপের বিষয় বলে মনে হয়।

তারা এটিকে এক ধরনের বেড়াজাল মনে করেন। কিন্তু যদি এই সেবকমূলক আচরণকে তাদের নিজস্ব আত্মসম্মান এবং মর্যাদার সাথে যুক্ত করা যায়, তবে পুরো সমীকরণটি পাল্টে যায়। যখন একজন কর্মকর্তা কিংবা কর্মচারি অনুভব করতে অভ্যস্ত হন যে, জনগণের সেবা করাই তার আত্মমর্যাদা এবং সম্মান, তখন তাকে আর আলাদা করে কোনো আদেশ দিয়ে সেবক বানাতে হবে না। তিনি নিজেই নিজের তাগিদে সেবকের ভূমিকা বেছে নেবেন।

যেকোনো সামাজিক পরিবর্তন বা মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তরের পেছনে প্রচার বা মিডিয়ার ভূমিকা অত্যন্ত শক্তিশালী। মানুষ যা দেখে এবং যা শুনে, অবচেতনভাবেই তার মনস্তত্ত্বে সেটাই প্রতিষ্ঠিত হয়। মানুষ তাদের মডেলদের যেমন বলতে শোনে, তাদের মডেলদের যেমন আচরণ করতে দেখে সেটাই তারা অবচেতনে গ্রহন করে। এটাই কৌশল। আমাদের গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরকারি কর্মচারীদের অনিয়ম, দুর্নীতি এবং অসদাচরণের খবর প্রচার বন্ধ করে তাদের ভালোকাজগুলো তুলে ধরতে হবে। 

আমাদের বিজ্ঞমাইন্ড-ইঞ্জিনিয়ারগণ ভালো করেই জানেন যে, ভালোর প্রচার জনগণের মাঝে ভালো আচরণ সৃষ্টি করে আর মন্দের প্রচার মন্দকেই কেবল উস্কে দেয়। 

অবশ্যই দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি থাকতে হবে এবং অপরাধীর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে যাতে তা অন্যদের জন্য সতর্ক বার্তা হয়। কিন্তু একই সাথে, মাঠপর্যায়ের সেইসব সৎ ও মানবিক সরকারি কর্মকর্তাদের খুঁজে বের করতে হবে, যারা নিজেদের গণ্ডির বাইরে গিয়ে সাধারণ মানুষের জীবন সহজ করে দিচ্ছেন।

কোনো তরুণ উপজেলা নির্বাহী অফিসার হয়তো দুর্গম চরাঞ্চলের মানুষের দোরগোড়ায় সরকারি সেবা পৌঁছে দিচ্ছেন, কিংবা কোনো পুলিশ কর্মকর্তা একজন অসহায় মানুষের ন্যায় বিচার নিশ্চিত করেছেন; এই ইতিবাচক উদাহরণগুলোকে জাতীয় গণমাধ্যমে রোল মডেল হিসেবে প্রচার করতে হবে।

যখন এই ধরনের ইতিবাচক উদাহরণগুলো জাতির মনস্তত্ত্বে প্রতিস্থাপন করা হবে, তখন তা সমাজের সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেবে। মানুষ তখন বুঝতে পারবে যে, প্রশাসন মানে আস্থার নাম। আর সরকারি কর্মচারীরাও যখন দেখবেন যে ভালো কাজের জন্য তাদের ওপর মহলের প্রশংসা এবং জাতিরপক্ষ থেকে ব্যাপক সম্মান ও ভালোবাসা জুটছে, তখন তারা ও এই ইতিবাচক প্রতিযোগিতায় নেমে পড়তে মোটিভেটেড হবেন। মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি হলো প্রশংসা পাওয়া এবং সম্মানিত হওয়া। 

ইতিবাচক প্রচার সেই মনস্তাত্ত্বিক ক্ষুধাকেই বৃদ্ধি করবে।
নস্তত্ত্ববিদগণ বলেন, মানুষ যুক্তি দিয়ে যতটা না শেখে, তার চেয়ে অনেক বেশি শেখে অনুকরণ করে এবং উদাহরণের মাধ্যমে।

কোনো নীতিবাক্য বা সার্কুলার মানুষের মনে দীর্ঘস্থায়ী দাগ কাটতে পারে না, যা একটি জীবন্ত এবং শক্তিশালী উদাহরণ পারে। তাই রাষ্ট্রীয় এই নির্দেশনাকে যদি সফল করতে হয়, তবে শুধু মৌখিক বা লিখিত আদেশে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। এটিকে জাতীয় মনস্তত্ত্বে গ্রথিত করতে হবে; যার জন্য কয়েকটি সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে:

১. মূল্যায়ন পদ্ধতির পরিবর্তন: এ পর্যন্ত সরকারি কর্মচারীদের পদোন্নতি বা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে মূলত তাদের সিনিয়রদের সন্তুষ্টি এবং রুটিন কাজের গতি বিবেচনা করা হতো। এখন থেকে এর সাথে যুক্ত করতে হবে ‘জনগণের সন্তুষ্টি সূচক’ বা পাবলিকস্যাটিস ফ্যাকশন ইনডেক্স। একজন কর্মকর্তাতার কর্ম এলাকায় সাধারণ মানুষের কাছে কতটা গ্রহণযোগ্য এবং কতটা সহজে সেবা দিতে পেরেছেন, তার ভিত্তিতে তাকে পুরস্কৃত করতে হবে। আধুনিক ডিজিটাল যুগে এই পদ্ধতির বাস্তবায়ন অত্যন্ত সহজ।

২. শিক্ষানবিশকালে মনস্তাত্ত্বিক মুল্যায়ন ও প্রশিক্ষণ: বিসিএস বা অন্যান্য ক্যাডার সার্ভিসের নিয়োগদানের ক্ষেত্রে তাদের নৈতিকতার মানদণ্ডকে অগ্রাধিকার দেয়া প্রয়োজন যেমনটা সামরিক বাহিনীর অফিসার ক্যাডেট নির্বাচনে দেয়া হয়। তাছাড়া ট্রেনিং একাডেমিতে আইন, কানুন ও ফাইলের কাজ শেখানোর পরিবর্তেই মোশনাল ইন্টেলিজেন্স, এম প্যাথি বা সহমর্মিতা এবং জনসেবার দর্শন নিয়ে গভীর মনস্তাত্ত্বিক প্রশিক্ষণ দিতে হবে। তাদের বোঝাতে হবে যে, রাষ্ট্রতাদের যে মেধা ও যোগ্যতার মূল্যায়ন করেছে, তার প্রতিদান দেওয়ার সময় হলো সাধারণ মানুষের সেবা করা।

৩. সামাজিক স্বীকৃতি ও সম্মাননা:  যারা জনবান্ধব উদ্যোগ গ্রহণ করবেন, তাদের জাতীয় পর্যায়ে রাষ্ট্রীয় পদক বা বিশেষ সম্মানে ভূষিত করতে হবে। তাদের এই সাফল্যের গল্প গুলো স্কুল-কলেজের পাঠ্যপুস্তক কিংবা গণমাধ্যমে এমনভাবে প্রচার করতে হবে যেন তরুণ প্রজন্মতাদের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে।

রাষ্ট্রীয় এই নির্দেশটি আমাদের প্রশাসনিক ব্যবস্থার অন্তিম রোগ নিরাময়ের এক মোক্ষম প্রেসক্রিপশন। কিন্তু প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী আইনের কড়াকড়ি বা শাস্তির ভয় দিয়ে হয়তো সাময়িক শৃঙ্খলা আনা সম্ভব, কিন্তু একটি মানবিক, সংবেদনশীল এবং জনবান্ধব প্রশাসন গড়ে তুলতে হলে কাঙ্ক্ষিত আচরণকে তাদের আত্মসম্মানবোধের সাথে যুক্ত করতে হবে। যখন একজন সরকারি কর্মী মানসিকভাবে অভ্যস্ত হবেন যে, জনগণের সেবা করা তার তার নিজের কাছে নিজের গৌরব এবং আত্মসম্মানের বিষয়, এবং একইসাথে যখন সমাজ ও রাষ্ট্র সেই কাজের জন্য তাকে সর্বোচ্চ সম্মান ও স্বীকৃতি দেবে, তখনই কেবল এই নির্দেশ সফলতার মুখ দেখবে।

 এ ইউ দৌলা
(মাইন্ড-ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ের গবেষক)


সংবাদটি শেয়ার করুন :
প্রতিবেদকের তথ্য
SHA.AZH

SHA.AZH

© স্বত্বাধিকারঃ যায়যায়দিন
কারিগরী সহযোগিতায় MULTISOFT