ঢাকা | সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬ ইং | ২৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ডোনাল্ড ট্রাম্প হেরে গেছেন জলপাই সবুজ স্পেনের কাছে

author
শাহীন রাজা

প্রকাশিত : ২২ জুলাই, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৩৫
ad003
ওয়ার্ল্ড কাপ ফাইনাসে হেরেছে আর্জেন্টিনা। হেরেছে ভোনাল্ড ট্রাম্পও। 'নিউ ইয়র্ক নিউ জার্সি স্টেডিয়াম'-এ উপস্থিত ৮৩ হাজার দর্শক ট্রাম্পের এই পরাজয় প্রত্যক্ষ করে। স্পেনেয়া বিজয়া নীরবে মেনে নিতে হয়। ডোনাল্ড ট্রাম্পের মনোবাসনা ছিল, স্পেনের পরাজয়। না তা পূর্ণতা পায়নি। এই পরাজয় ঠেকাতে, পারমাণবিক বোমা বহনকারী মিসাইল কিংবা যুদ্ধ বিমান এই পরাজয় ঠেকাতে কোনো কাজে আসেনি। এমনকি সুসজ্জিত মেরিন বা অত্যাধুনিক সাজোয়া বহরও কোনো কাজেই আসেনি। হেরে যেতে হয়েছে মানুষের মানবিক শক্তির কাছে যুগে যুগে মানব শক্তি এভাবেই দানবদের পরাজিত করে ইতিহাস সৃষ্টি করেছে।

ইরান এবং প্যালেস্টাইনের সাধারণ জনগণকে হত্যা করতে স্পেনের বিমান বন্দর এবং আকাশ সীমা ব্যবহার করতে চেয়েছিল ট্রাম্প। কিন্তু এই অমানবিক কাজের সহযোগী হতে অস্বীকার করে স্পেন। স্পেনের এই অস্বীকার মানতে পারেনি ট্রাম্প। পশ্চিম ইওরোপের অনগ্রসর একটি দেশ স্পেন। এমন একটা দেশ তার এই প্রস্তাব প্রত্যাখান করবে তা ভাবতেই পারেনি ট্রাম্প। বিস্ময়ে, বিস্মিত হয়ে পড়েন। স্পেনের এত সাহস হয় কি করে? দেশটিকে শায়েস্তা করার সবপ্ল্যান অট্রেন ট্রাম্প সাহেব।

স্পেনকে শায়েস্তা করতে ট্রাম্প হুমকি-ধমকি দিতে থাকেন। ঘোষণা দেন, স্পেনের সঙ্গে সব ধরনের বাণিজ্য চুক্তি বাতিল করা হবে। এমনকি সামরিক জোট 'নেটো' সদস্য পদ থেকেও স্পেনকে বহিষ্কার করারও হুমকি দেয়া হয়। বিশ্ব রাজনীতিতে আমেরিকা হচ্ছে মোড়ল। এই মোড়লের হুমকি-ধমকিকে অগ্রাহ্য করার সাহস খুব কম দেশেরই আছে। সবাই চায় আমেরিকার সঙ্গে স্পেনের সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলতে। কিয় না স্পেনকে দেখা যায় তার ব্যতিক্রম। স্পেন তার ঘোষিত নীতিতে অটল থাকে। কোনো হুমকিতেই আমেরিকার আগ্রাসী কর্মকারে নতিস্বীকার করেনি।

আমেরিকার সঙ্গে স্পেনের ঐতিহাসিক সম্পর্ক। কলম্বাস যদিও ছিলেন ইটালীয় নাগরিক। কিন্তু তিনি স্পেনের রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ইনডিয়া আবিষ্কার করতে গিয়ে ভুল করে আমেরিকা আবিষ্কার করে ফেলেন। সেই থেকে সম্পর্ক। তবেইতিহাসের নিরিখে এই সম্পর্ক হচ্ছে 'প্রেম এবং ঘৃথর'। আমেরিকা, বৃটেনের বিরদ্ধে স্বাধীনতা যুদ্ধ (১৭৭৬-১৭৯৫) গুরু করলে স্পেন মিত্র হিসেবে আমেরিকাকে সহযোগিতা করে। গোপনে সমরাস্ত সরবরাহ করে। এমনকি আমেরিকার স্বাধীনএকার্থী যোদ্ধাদের পক্ষ হয়ে ফরাশি সৈন্যরা যুদ্ধেও অংশ নেয়। যার প্রেক্ষিতে ১৭৯৫ সালে আমেরিকার মাধীনতা লাভের পর দুই দেশের মধ্যে 'পিংকুস টুটি নামে একটা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

১৮৯৮ সালে এসে এই মিত্রতা শত্র সম্পর্কে রূপ নেয়। আমেরিকা স্বাধীনতা লাভের পর দুশো বছরের মধ্যে আর্থিক এবং সামরিক শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রের পথে চলা শুরু করে। তাই অপর দেশের মোড়লিপনা আর মেনে নিতে রাজি নয়। অনেক দিন ধরেই আমেরিকা প্ল্যান করে, কি করে। স্পেনের ক্ষমতা খর্ব করা যায়। ঠিক সেই সময় হাভানা বন্দরে আমেরিকা যুদ্ধজাহাজ 'মেইন' বিস্ফোরণ ও ডুবে যায়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধের সূত্রপাত ঘটে এবং এই যুদ্ধে নতুন শক্তি আমেরিকার কাছে স্পেন শোচনীয় পরাজিত হয়। যুদ্ধ-পরবর্তীতে স্পেন তার নিয়ন্ত্রিত ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র (কিউবং পুয়ের্তো রিকো অয়াম ও ফিলিপিন্স) আমেরিকার কাছে হস্তান্তর করতে বাধ্য হয়। স্পেনকে পরাজিত করার মধ্য দিয়েই আমেরিকা বৈশ্বিক পরাশক্তি হিসেবে প্রকাশ পায়। 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আবারো স্পেনের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্ক পুন্যস্থাপন হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর, ১৯৫৩ সালে আমেরিকা ও স্পেনের মধ্যে এক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর মাধ্যমে স্পেনে, আমেরিকা বেশ কয়েকটি সামরিক ঘাটি স্থাপন করে। যা তাজ পর্যন্ত যৌথভাবে পরিচালিত হওয়ার কথা। বর্তমানে নেটো (NATO) ও পশ্চিমা সামরিক জোটে দেশ দুটি একে অপরের ঘনিষ্ঠ অংশীদার।

কিন্তু বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার আগ্রাসী কর্মকান্ডে স্পেনের সমর্থন লাভে ব্যর্থ হয়েছে। সমর্থন না পেয়ে অমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম স্পেনের ওপপা ক্ষিপ্ত। সব ধরনের সম্পর্ক ছিন্ন করারও হুমকি দিয়ে চলছেন। এমন এক সময় আমেরিকায় অনুষ্ঠিত হয় ফুটবল ওয়ার্ল্ড কাপ। অবশেষে ফাইনাল খেলায় স্পেন বিজয়ী হয় এবং স্পেনের এই বিজয় দর্শকের গ্যালারিতে বসে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রত্যক্ষ করেন। স্পেনের বিজয় এবং নিজের পরাজয় নিজের চোখে দেখতে হয়েছে। নিজের পরাজয় নিজের চোখে দেখা কতটা যে নির্মম সেদিন তিনি উপলব্ধি করেছেন হয়তো। যদি উনার প্রেতরে বোধ নামে কোনো অস্তিত্ব থাকে।

 ১৯ জুলাই 'নিউ ইয়র্ক নিউ জার্সি' স্টেডিয়ামে স্পেনের বিদ্রোহী পরাবাস্তববাদী চিত্রশিল্পী সালভাদর ডালির প্রতিচিত্র দেখতে পাই। নাম তার চার 'লামিন ইয়ামাল'! ওয়ার্ল্ড কাপ ফাইনাল খেলায় বিজয়ী হওয়ার এক জন অন্যতম নায়ক। খেলা শেষে মেডেল নিতে ধীর পায়ে মঞ্চের দিকে এগুতে থাকে। বিনয়ী ভঙ্গিতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছ থেকে মেডেল গলায় নেন। কিন্তু হাত না মিলিয়েই ট্রাম্পের সামনে থেকে বীরদর্পে প্রস্থান করেন। এত বিনয়ী ভঙ্গিতে প্রস্থান এবং প্রত্যাখ্যান এই প্রথম দেখলাম। ১৯ বছর বয়সী এক জন যুবক কি করে এতটা সাহসী হতে পারে! হয়তো ১৯ বছর বয়স বলেই গেয়েছে। যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার বা রাষ্ট্র প্রধান আমেরিকার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে হাত মেলানোর জন্য দিনক্ষণ হিসাব করে। সেখানে অবলীলায় অবজ্ঞা করে প্রস্থান করে! 

এর একমাত্র কারণ হচ্ছে, সে যা বিশ্বাস কর তা সে ধারণ করে। 'লামিন ইয়ামাল'-এর বিশ্বাস প্যালেস্টাইনে নিরীহ জনগণ হত্যাযজ্ঞের মদদদানকারী ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফুটবল ওয়ার্ল্ড কাপ টুর্নামেন্টে তার দলের প্রতি খেলায় প্যালেস্টাইনের পতাকা নিয়ে নেমেছে। এর একমাত্র কারণ বিশ্ববাসীর কাছে প্যালেস্টাইনের নিরীহ জনগণের পক্ষে প্রচার করা যাতে বিশ্ববাসী গণহত্যার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়। এই একটি কারণে 'লামিন ইয়ামাল' দীর্ঘদিন ফুটবলপ্রেমীদের কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। ফুটবল ওয়ার্ল্ড কাপে স্পেনের বিজয় এবং লামিন ইয়ামালের সাহস বলে দেয়, দারগান্ত ছাড়াও বিশ্ব জয় করা যায়। যে জয় হত্যাযজ্ঞের মাধ্যমে হয় না। মানবিক শৈলী ও ভালোবাসা দিয়ে এবং এই জয় হচ্ছে সভ্যতার ইতিহাসে চিরস্থায়ী। আমেরিকার জনগণকে তা বুঝতে হবে।

লেখক-


শাহীন রাজা: সিনিয়র সাংবাদিক

সংবাদটি শেয়ার করুন :
প্রতিবেদকের তথ্য
SH.AL

SH.AL

© স্বত্বাধিকারঃ যায়যায়দিন
কারিগরী সহযোগিতায় MULTISOFT