ঢাকা | শুক্রবার, ০২ অক্টোবর ২০২৬ ইং | ১৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
বাল্যবিবাহের অন্ধকার চিরে আশার দীপশিখা

ওয়ার্ল্ড ভিশনের সেমিনারে সর্বস্তরের ধর্মীয় ও সামাজিক নেতাদের দীপ্ত অঙ্গীকার

author
জাবেদ আবেদীন শাহীন, কক্সবাজার

প্রকাশিত : ২৩ জুলাই, ২০২৬ সকাল ৮:১৭
ad003
কন্যাশিশুর শৈশব, শিক্ষা ও স্বপ্নকে গ্রাস করে নেওয়া বাল্যবিবাহের অমানবিক শৃঙ্খল ভাঙতে তৃণমূল থেকে প্রতিহত করার ঐতিহাসিক ঘোষণা হয়েছে। ওয়ার্ল্ড ভিশনের সেমিনারে সর্বস্তরের নেতাদের ঐক্যবদ্ধ ডাক কক্সবাজারের মাটি থেকে চিরতরে বাল্যবিবাহের কলঙ্ক মুছে ফেলার এক দৃপ্ত আহ্বানের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল এক বিশেষ সেমিনার।

বুধবার (২২ জুলাই) সকাল ১১টায় সদর উপজেলা পরিষদের মসজিদসংলগ্ন সম্মেলন কক্ষে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে এই আবেগঘন ও প্রাঞ্জল সেমিনারের আয়োজন করে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা‘ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ চাইল্ড সেইফটি নেট প্রজেক্ট’ কক্সবাজার। তিনটি ইউনিয়নের শতাধিক ইমাম, মুয়াজ্জিন, মাওলানা, হিন্দু ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ধর্মীয় নেতা এবং সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে সম্মেলন কক্ষটি হয়ে উঠেছিল সামাজিক দায়বদ্ধতা ও চেতনার এক অনন্য মিলনম

অনুষ্ঠানে সভাপতির আসর অলঙ্কৃত করেন কক্সবাজার বড়বাজার জামে মসজিদের ইমাম ও উপজেলা চাইল্ড অ্যাডভাইজরি অ্যান্ড ট্রান্সফরমেশন (চ্যাট) কমিটির সভাপতি মাওলানা কামাল উদ্দিন। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মহিলা ও শিশু বিষয়ক অধিদপ্তর, কক্সবাজারের উপপরিচালক সুব্রত বিশ্বাস। এয়াড়াও বিশেষ অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন কক্সবাজার ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উপ—পরিচালক সরওয়ার আকবর, বিশিষ্ট সিনিয়র সাংবাদিক জাবেদ আবেদীন শাহীন, মোবিলাইজেশন অ্যান্ড সিস্টেম স্ট্রেন্দেনিং অফিসার পার্থ প্রতীম বাগচী, চ্যাট কমিটির সহসভাপতি পণ্ডিত পল্লব চক্রবর্তী, জ্যেষ্ঠ সদস্য সুশান্ত নাথ এবং সদস্য মিন্টু ভান্তে সহ বহু গুণীজন। পুরো অনুষ্ঠানটি অত্যন্ত প্রাণবন্ত ও সাবলীল ভাষায় সঞ্চালনা করেন সদর উপজেলা মডেল মসজিদের ইমাম ও খতিব এবং ঝিলংজা ইউনিয়ন চ্যাট কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ উল্লাহ।

অনুষ্ঠানের শুরুতেই বক্তারা সমাজের গভীরে প্রোথিত বাল্যবিবাহের ক্ষত নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও সমবেদনা প্রকাশ করেন। আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বক্তারা তুলে ধরেন একটি শিশুকন্যার করুণ বাস্তবতা সভাপতির বক্তব্যে মাওলানা কামাল উদ্দিন বলেন, একটি বাল্যবিবাহ মানে কেবল একটি আইনি অপরাধ নয় এটি একটি নিষ্পাপ কুঁড়িকে ফুটার আগেই ছিঁড়ে ফেলার শামিল। যখন একটি ছোট্ট মেয়ের হাতে বইয়ের বদলে সংসারের দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয়, তখন বস্তুত তার রক্তমাংসের অস্তিত্বের ওপর এক অদৃশ্য শেকল চাপিয়ে দেওয়া হয়। ইসলাম কখনোই অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের বিয়েকে উৎসাহিত করে না। প্রতিটি শিশুর নিরাপদ শৈশব, শিক্ষা ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করা আমাদের ধর্মীয় ও মানবিক দায়িত্ব। খুতবা, ওয়াজ মাহফিল ও ধর্মীয় সমাবেশে বাল্যবিবাহের কুফল নিয়মিত তুলে ধরতে হবে। 

প্রধান অতিথির বক্তব্যে মহিলা ও শিশু বিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক সুব্রত বিশ্বাস আইনি কঠোরতার পাশাপাশি হৃদয়ের অনুভূতির ওপর জোর দিয়ে বলেন, শুধু আইনের শুষ্ক প্রয়োগ কিংবা প্রশাসনিক শাসন দিয়ে বাল্যবিবাহ নামের এই সামাজিকব্যাধি নির্মূল করা অসম্ভব। এর জন্য প্রয়োজন আমাদের ভেতরের পারিবারিক অনুশোচনা, আত্মিক দায়িত্ববোধ এবং সামাজিক চেতনার তীব্র স্ফুরণ। আমাদের অভিভাবকদের হৃদয় দিয়ে বুঝতে হবে—কন্যা সন্তান কোনো দায় নয়, সে আমাদের সমাজের ভবিষ্যৎ আলোকবর্তিকা। তাকে শিক্ষিত হতে দিন, স্বাবলম্বী হতে দিন, তবেই একটি জাতি মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে।
ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উপপরিচালক সরওয়ার আকবর তাঁর বক্তব্যে যোগ করেন, ধর্মীয় ও সামাজিক নেতাদের কণ্ঠস্বর সমাজের প্রতিটি ঘরে পৌঁছায়। মসজিদ, মন্দির ও সামাজিক অনুষ্ঠানগুলোকে আমাদের সচেতনতার রক্তিম মশাল বানিয়ে তুলতে হবে। বাল্যবিবাহের ভয়াবহ পরিণতি ও কুফল নিয়ে যখন আমরা নিয়মিত কথা বলব, তখন সমাজের অন্ধত্ব দূর হতে বাধ্য। প্রতিটি ধর্মই নারীর মর্যাদা ও অধিকার সুরক্ষার কথা বলে তাই আজ আমাদের ঐক্যের শপথ নিতে হবে।

সিনিয়র সাংবাদিক জাবেদ আবেদীন শাহীন তাঁর বক্তব্যে মিডিয়ার ভূমিকা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, যে বয়সে একটি মেয়ের হাতে থাকার কথা নতুন পাঠ্যবই আর রঙিন স্বপ্ন, সে বয়সে তাকে ঠেলে দেওয়া হয় এক অনিশ্চিত ও যন্ত্রণাদায়ক জীবনের মুখে। কলম ও কণ্ঠের শক্তিতে আমাদের এই নীরব কান্না থামাতেই হবে। প্রতিটি শিশুকন্যাকে রক্ষা করা আমাদের নৈতিক পিতৃদায়।

মোবিলাইজেশন অ্যান্ড সিস্টেম স্টে্রন্দেনিং অফিসার পার্থ প্রতীম বাগচী বলেন, বাল্যবিবাহ একটি সামাজিক বিপর্যয়। এটি শুধু একটি মেয়ের জীবনকেই বিপন্ন করে না, বরং একটি পরিবারের, এমনকি একটি জাতির অগ্রযাত্রাকেও ব্যাহত করে। তিনি আরো বলেন, চাইল্ড সেইফটি নেট প্রজেক্টের মূল লক্ষ্য হলো শিশুদের জন্য নিরাপদ সামাজিক পরিবেশ নিশ্চিত করা। প্রশাসন, ধর্মীয় নেতা, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, সাংবাদিক ও অভিভাবকদের সমন্বিত অংশগ্রহণ ছাড়া বাল্যবিবাহ নির্মূল সম্ভব নয়। সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।
  
সেমিনারে উপস্থিত ধর্মীয় ও সামাজিক নেতৃবৃন্দ একযোগে অঙ্গীকার করেন যে, প্রতিটি ইউনিয়নের তৃণমূল পর্যায় থেকে বাল্যবিবাহের শিকড় উপড়ে ফেলতে তারা ঢাল হয়ে দাঁড়াবেন। বাল্যবিবাহ এমন এক সামাজিক অভিশাপ, যা একটি কন্যাশিশুর শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও স্বাভাবিক মানসিক বিকাশকে নিষ্ঠুরভাবে পঙ্গু করে দেয়। অনূঢ়া বয়সে পিঁড়িতে বসা একটি মেয়ের স্বপ্ন, তার সম্ভাবনা এবং আত্মনির্ভরশীল ভবিষ্যতের পথ চিরতরে অবরুদ্ধ হয়ে যায়। ধর্ম কখনো কোনো শিশুর জীবনকে অন্ধকার গহ্বরে ঠেলে দিতে শেখায় না তাই এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে মিম্বার থেকে আমাদের প্রথম প্রতিবাদ তুলতে হবে।

অনুষ্ঠানের সমাপনীতে প্রস্ফুটিত হয় এক শুভ সঙ্কল্প। উপস্থিত সর্বস্তরের মানুষ সর্বসম্মতিক্রমে এ বিষয়ে একমত হন যে, কক্সবাজার জেলাকে বাল্যবিবাহ মুক্ত করতে সমাজকে আজ অগ্রণী ও কঠোর ভূমিকা পালন করতে হবে। কন্যা শিশুরা যেন শিক্ষার আলোয় আলোকিত হয়ে সমাজ ও দেশ গঠনের মূল চালিকাশক্তি হতে পারে এবং পর্যটন নগরী কক্সবাজারের মাটিতে যেন আর কোনো বাল্যবিবাহের মতো নির্মম ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে এই দীপ্ত শপথে শেষ হয় আবেগঘন সেমিনারটি।
সংবাদটি শেয়ার করুন :
প্রতিবেদকের তথ্য
SHA.AZH

SHA.AZH

© স্বত্বাধিকারঃ যায়যায়দিন
কারিগরী সহযোগিতায় MULTISOFT