উত্তরাধিকার সূত্রে একটি ভঙ্গুর ও ধ্বংসপ্রাপ্ত অর্থনীতি পেয়েছে বিএনপি সরকার। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দেশে মূল্যস্ফীতি কমেনি, বেড়েছে বেকারত্ব। বিনিয়োগ কমে, বেড়ে যায় দারিদ্র্যতা। কোন কালপর্বেই দেশের অর্থনীতি এতো ক্ষতির মুখে পড়েনি। সরকারপ্রধানও একাধিকবার বলেছেন, ৩০ লাখ কোটি টাকার ঋণের বোঝা নিয়ে যাত্রা শুরু করেছে তাঁর সরকার। ফলে সূচনা লগ্ন থেকেই জটিল অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় বিশেষ মনোযোগ ও সময় দিতে হচ্ছে নতুন সরকারকে। অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে দেশের ইতিহাসে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বৃহৎ জনমুখী বাজেটে নতুন স্বপ্ন দেখানো হয়েছে। সরকার ২০৩৪ সাল অর্থাৎ আগামী ৮ বছরের মধ্যে ট্রিলিয়ন (এক লাখ কোটি) ডলারের অর্থনীতির মাইলফলক অর্জনের টার্গেট নিয়েছে।
সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি মাথাপিছু আয় বাড়ানোর জন্য কর্মসংস্থান, উৎপাদন, রপ্তানি, প্রবাসী আয়, দক্ষতা উন্নয়ন বা সামাজিক সুরক্ষা সবক্ষেত্রেই সমান তালে গুরুত্ব দিতে চায় সরকার। বিনিয়োগ বৃদ্ধি, রাজস্ব আহরণ সম্প্রসারণ ও বেসরকারি খাতের বিকাশকে অগ্রাধিকার দেওয়ার মাধ্যমে নিশ্চিত করা সম্ভব হবে টেকসই প্রবৃদ্ধি। সুদৃঢ়, ন্যায়ভিত্তিক ও অন্তর্ভূক্তিমূলক অর্থনীতি গড়তে বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও সাফল্যের নতুন দিগন্ত উন্মোচনে ব্যবসায়ীদের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। গত বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) সকালে রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফআইসিসিআই) আয়োজনে ‘বাংলাদেশে কর্মসংস্থান ও সমৃদ্ধির লক্ষ্যে বৈদেশিক বিনিয়োগ ত্বরান্বিতকরণ’ শীর্ষক এফআইসিসিআই এফডিআই সম্মেলনে তিনি এই আহ্বান জানান।
‘সরকার ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তর করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ’-এমন কথা পুনর্ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী সাফ সাফ জানিয়ে দিয়েছেন তাঁর বার্তা। তিনি বলেছেন, ‘আজ আমি আপনাদের একটি সহজ ও স্পষ্ট বার্তা দিতে চাই: নতুন ও দূরদর্শী বিএনপি সরকার চায়—আপনারা বাংলাদেশে আসুন, নতুন উদ্যোগ নিন এবং ব্যবসা প্রসারিত করুন। আপনি দেশীয় উদ্যোক্তা হোন কিংবা বিদেশি বিনিয়োগকারী—আপনি যখন বাংলাদেশে মূলধন বিনিয়োগ করবেন, তখন আমাদের সরকারও তার সময়, প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা এবং সময়োপযোগী নীতিমালার মাধ্যমে আপনার পাশে থাকবে। এটি কেবল একটি আশ্বাস নয়, ইনশাল্লাহ এটি আমাদের সরকারের সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার।’
বর্তমানে দেশে অর্থনীতির আকার অর্ধট্রিলিয়ন ডলার। গত মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহের শুরুতে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) প্রকাশিত সাময়িক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির আকার ৬১ লাখ ২০ হাজার ২০৯ কোটি টাকার কথা উল্লেখ করা হয়। যা মার্কিন ডলারে প্রায় ৫০১ বিলিয়ন বা অর্ধ ট্রিলিয়ন ডলার। বিবিএস-এর তথ্যমতে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি সাময়িকভাবে ৪.১৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের ৩.৪৯ শতাংশের তুলনায় কিছুটা বেশি। মূলত বিনিয়োগ, উৎপাদনশীলতা, রপ্তানি এবং রাজস্ব সক্ষমতা বাড়ানো গেলেই এক ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হওয়া সম্ভব বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। সরকার এরই মধ্যে ‘থ্রি-আর’ কৌশল উন্মোচন করেছে। এই কৌশলের মধ্যে রয়েছে রিকভারি অ্যান্ড স্ট্যাবিলাইজেশন, রিস্টোরেশন এবং রিকনস্ট্রাকশন ফর অ্যাক্সিলারেশন। সরকার তিন ধাপে এই কৌশল বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। চলতি বছরের শুক্রবার (১২ জুন) নিজের ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন জানান, অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চারের লক্ষ্যে বাজেটে ঘোষিত পরিকল্পনা তিনটি ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে, যা ‘থ্রি-আর স্ট্র্যাটেজি’ নামে অভিহিত করা হয়েছে। তিনি বলেছেন, রিকভারি অ্যান্ড স্ট্যাবিলাইজেশন: অর্থনীতির পুনরুদ্ধার ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার এ কার্যক্রমের মেয়াদ এক বছর। রেস্টোরেশন বলতে অর্থনীতির উত্তরণ ও কাঠামোগত সংস্কারের এ ধাপ বর্তমান সরকারের প্রথম থেকে তৃতীয় বছরের মধ্যে বাস্তবায়ন করা হবে। রিকনস্ট্রাকশন ফর অ্যাকসিলারেশন হিসেবে দীর্ঘমেয়াদি সমৃদ্ধ অর্থনীতি গঠনের লক্ষ্যে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির মাইফলক ছুঁতে যেকোনভাবেই দেশের অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখতে চায় বিএনপি সরকার। প্রথমেই সরকার ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে সামাজিক সুরক্ষা বলয় নিশ্চিতে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছে। বাজেটে গ্রামীণ অর্থনীতি, কৃষি, সেচ ব্যবস্থা এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে (এসএমই) প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। সরকার তৃণমূলের ব্যবসায়ী ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণ প্রবাহ সহজ করার পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, ‘ব্যাংক খাতের ঋণ প্রবাহ সহজীকরণ এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে বাংলাদেশ ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে সিএমএসএমই খাতের জন্যই ৫ হাজার কোটি টাকা রাখা হয়েছে।’ এছাড়াও ‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান কার্ড’ ও ‘ওয়ান ডিজিটাল আউটলেট’ চালুর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। যার মাধ্যমে প্রথম ধাপে দেশের প্রতিটি মানুষের ব্যাংক হিসাব নিশ্চিত করা হবে। বাড়ানো হচ্ছে ডিজিটাল লেনদেনের পরিধি। বাংলা কিউআর বা কুইক রেসপন্স কোড বাধ্যতামূলক ও সর্বজনীন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান দেশের সব ব্যাংকের এমডিদের নিয়ে ছবি তুলে ও লেনদেন করে বাংলা কিউআর অ্যাপ বাধ্যতামূলক করেছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, দিনে এখন ৩৫ থেকে ৩৭ হাজার লেনদেন হচ্ছে বাংলা কিউআর ব্যবহার করে। এতে দৈনিক লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১১ থেকে ১২ কোটি টাকা। মুদ্রা নোট ছাপাতে সরকারকে বছরে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করতে হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনায় ক্যাশলেস সমাজ গঠনে এই পদক্ষেপ পুরোপুরি কার্যকর হলে বিশাল অংকের ব্যয় বাঁচবে সরকারের। তাছাড়া ডিজিটাল এই লেনদেনে কর ফাঁকির কোন সুযোগ নেই। কমে আসবে কর পরিহার বা জালিয়াতির সুযোগও।
এরই মধ্যে সুসংবাদ দিয়েছে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা)। সম্প্রতি গোল্ডেন অয়েল মিলস লিমিটেড ও ডেল্টা এপিআই লিমিটেডের সঙ্গে ভূমি ইজারা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। তাঁরা জানিয়েছে, জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে (এনএসইজেড) আরও প্রায় ৬৫.১ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের নতুন বিনিয়োগ আসছে। নতুন এই বিনিয়োগের আওতায়, গোল্ডেন অয়েল মিলস ২০ একর জমিতে ৫২.৮০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করবে। সেখানে তারা খাদ্য, হিমায়িত খাদ্য, আইসক্রিম, বিশেষায়িত তেল ও ফ্যাট, প্যাকেজিং এবং ইলেকট্রনিক্স পণ্য উৎপাদন করবে। বড় পরিসরের এই প্রকল্পে প্রায় ৬ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। অন্যদিকে, ডেল্টা এপিআই ১২ একর জমিতে ১২.৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করে অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্টস (এপিআই) বা ওষুধের কাঁচামাল উৎপাদন কারখানা স্থাপন করবে। এই কারখানায় আরও প্রায় ২০০ জনের কর্মসংস্থান তৈরি হবে। চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলেন, ‘দেশীয় শিল্পগোষ্ঠীর এই নতুন বিনিয়োগ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থার প্রতিফলন।’
চরম সংকটেও ধীরস্থির, শান্ত, কোমল এবং কঠোর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শুরু থেকেই উৎপাদন বৃদ্ধি থেকে শুরু করে নতুন নতুন কর্মসংস্থান তৈরি, রাজস্ব বৃদ্ধি ও বিনিয়োগ বাড়ানোর মাধ্যমে খাদে পড়া অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে উদ্যোগ নিয়েছেন। বিপুল প্রত্যাশা মাথায় নিয়ে অর্থনীতির বন্ধুর পথ পাড়ি দিচ্ছেন। রাষ্ট্র মেরামতে পূর্ণোদ্যমে কাজ করছেন। দিন-রাত ১৮ ঘণ্টা কঠোর পরিশ্রম করছেন। সামগ্রিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত, সমন্বিত ও বহুমাত্রিক কৌশল বা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। বিনিয়োগকারী, শিল্পোদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী, অর্থনীতিবিদ, উন্নয়ন সহযোগি ও নীতি নির্ধারকদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। গুরুত্ব দিয়ে সবার কথা শোনেছেন। সম্প্রতি ‘বাংলাদেশে কর্মসংস্থান ও সমৃদ্ধির লক্ষ্যে বৈদেশিক বিনিয়োগ ত্বরান্বিতকরণ’ শীর্ষক এফআইসিসিআই এফডিআই সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন- ‘আসুন আমরা একসাথে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাই; নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করি এবং আগামীর বাংলাদেশকে নতুন করে গড়ে তুলি। আসুন, একটি সমৃদ্ধ ও বৈশ্বিকভাবে সংযুক্ত বাংলাদেশ গড়ার এই অগ্রযাত্রায় আমরা অংশীদার হই।’
লেখক : সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক সন্ধানী বার্তা; অ্যাকটিং এডিটর, কালের আলো.কম। [email protected]