ঢাকা | রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬ ইং | ২৬ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

একমাত্র সন্তানও ‘সহোদর’, নতুন বিতর্কে প্রধান শিক্ষক

author
নেত্রকোণা প্রতিনিধি

প্রকাশিত : ২৭ জুলাই, ২০২৬ সকাল ৯:৪৮
ad003
নেত্রকোণার ঐতিহ্যবাহী মোহনগঞ্জ পাইলট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে সপ্তম শ্রেণির ভর্তি কার্যক্রমকে ঘিরে নতুন করে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সহোদর কোটায় ভর্তি নিশ্চিত করতে উচ্চ আদালতে ভুল তথ্য উপস্থাপনের জন্য বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শেখ মোহাম্মদ আব্দুল ওয়াদুদ ভুয়া প্রত্যয়ন দিয়েছেন—এমন অভিযোগে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, যাদের একজনের কোনো সহোদর বিদ্যালয়টিতে পড়ে না এবং অপরজন বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান হওয়া সত্ত্বেও তাদের সহোদর কোটায় ভর্তির সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

অভিযোগের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর বিষয়টি তদন্তে নেমেছে উপজেলা প্রশাসন। জেলা প্রশাসকও তদন্তের নির্দেশ দেওয়ার কথা জানিয়েছেন।

বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের ১৭ এপ্রিল উচ্চ আদালত দুই শিক্ষার্থীকে ভর্তি করানোর নির্দেশ দেন। পরে আদালতের আদেশের আলোকে উপজেলা ভর্তি কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাদের সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি করা হয়।

ভর্তি হওয়া দুই শিক্ষার্থী হলেন—মোহনগঞ্জ পৌর শহরের টেংগাপাড়া এলাকার মাহমুদুল হাসান চৌধুরী মানিকের মেয়ে মাহফুজা হাসান এবং একই এলাকার মঞ্জুরুল হকের মেয়ে মারিয়া আক্তার মীম।

বিদ্যালয়ের নথি অনুযায়ী, মাহফুজা হাসান সপ্তম শ্রেণির প্রভাতী শিফটের ‘ক’ শাখায় এবং মারিয়া আক্তার মীম দিবা শিফটের ‘ক’ শাখায় অধ্যয়ন করছে।

তবে স্থানীয় অনুসন্ধানে জানা গেছে, মাহফুজা হাসানের কোনো ভাই বা বোন ওই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নন। অন্যদিকে মারিয়া আক্তার মীম তার বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। ফলে সহোদর কোটায় তাদের ভর্তির যৌক্তিকতা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সহোদর কোটায় ভর্তির জন্য সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীর ভাই বা বোন একই বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত—এ মর্মে প্রধান শিক্ষকের প্রত্যয়নপত্র বাধ্যতামূলক। অভিযোগ রয়েছে, ওই প্রত্যয়নের ভিত্তিতেই আদালতে রিট আবেদন করা হয় এবং পরে আদালতের নির্দেশে ভর্তি সম্পন্ন হয়। তাদের দাবি, শুধু এই দুই শিক্ষার্থী নয়, একই কৌশলে আরও কয়েকজনকে ভর্তি করানো হয়েছে। এতে মেধাতালিকায় থাকা অনেক শিক্ষার্থী ভর্তির সুযোগ হারিয়েছে।

এ বিষয়ে মারিয়া আক্তার মীমের মা তাসলিমা আক্তার বলেন, তার মেয়ে সহোদর কোটায় নয়, ক্যাচমেন্ট এরিয়া কোটায় ভর্তি হয়েছে। আইনগত পুরো বিষয়টি অন্য এক অভিভাবক পরিচালনা করেছেন বলে তিনি দাবি করেন।

অন্যদিকে মাহফুজা হাসানের বাবা মাহমুদুল হাসান চৌধুরী মানিক এ বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে এর আগে তিনি সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, অপেক্ষমাণ তালিকায় তার মেয়ের অবস্থান ছিল ৫০ নম্বরে। অথচ ৪৮ নম্বর পর্যন্ত শিক্ষার্থী ভর্তি হলেও তার মেয়েকে ভর্তি করা হয়নি। পরে তিনি দুর্নীতি দমন কমিশনে অভিযোগ করেন এবং আদালতের রায়ের ভিত্তিতেই তার মেয়ের ভর্তি হয়েছে বলে দাবি করেন।

প্রভাতী শিফটের শ্রেণিশিক্ষক আল আমিন বলেন, “প্রধান শিক্ষক আমাকে আদালতের আদেশ দেখিয়েছেন। সেই আদেশ অনুযায়ী শিক্ষার্থীকে ভর্তি করা হয়েছে। এর বাইরে কিছু জানি না।”
দিবা শিফটের শ্রেণিশিক্ষক আবু বসির বলেন, “প্রধান শিক্ষক আদালতের রায় ও ভর্তি কমিটির সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে ভর্তি সম্পন্ন করেন। পরে শুনেছি, সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীর কোনো সহোদর বিদ্যালয়ে পড়ে না। বিষয়টি নিয়ে আমার কিছু বলার নেই।”

ভর্তি বঞ্চিত অভিভাবক খান বায়েজিদ বলেন, “আমার সন্তান মেধাতালিকায় থাকার পরও ভর্তি হতে পারেনি। অথচ ভুয়া তথ্যের মাধ্যমে আদালতের আদেশ এনে ভর্তি করানো হয়েছে। এতে বড় ধরনের ভর্তি বাণিজ্যের আশঙ্কা করছি। নিরপেক্ষ তদন্ত হলে আরও অনিয়ম বেরিয়ে আসবে।”

তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শেখ মোহাম্মদ আব্দুল ওয়াদুদ। তিনি বলেন, “অভিভাবকরা উচ্চ আদালতের আদেশ নিয়ে এসেছেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সভাপতিত্বে ভর্তি কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ভর্তি করা হয়েছে। আমি কোনো ভুয়া প্রত্যয়ন দিইনি। তারা কীভাবে আদালতের রায় পেয়েছেন, সেটি আমার জানা নেই।”

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও ভর্তি কমিটির সভাপতি আমেনা খাতুন বলেন, “বিষয়টি সামনে আসার পর প্রধান শিক্ষকের কাছ থেকে ভর্তি-সংক্রান্ত সব নথিপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে। উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে সেগুলো যাচাই করতে বলা হয়েছে। আদালতের নির্দেশে যেসব ভর্তি হয়েছে, সবগুলোই খতিয়ে দেখা হবে। কোনো অনিয়ম পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মাহবুবুল কবীর বলেন, “ইউএনও আদালতের দুটি আদেশ আমার কাছে জমা রাখতে দিয়েছেন। তদন্তের বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা পাইনি। এ বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছি।”
এদিকে জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান বলেন, “অভিযোগটি তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা মিললে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

উল্লেখ্য, এর আগেও একই বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শেখ মোহাম্মদ আব্দুল ওয়াদুদের বিরুদ্ধে বিদ্যালয়ের সরঞ্জাম কেনাকাটায় প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে। ওই ঘটনায় গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) তদন্ত করে। 

ময়মনসিংহ বিভাগের উপপরিচালক মো. নাসির উদ্দীনের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি অভিযোগের সত্যতা পেয়ে প্রতিবেদন জমা দিলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

সাম্প্রতিক সহোদর কোটায় ভর্তি-সংক্রান্ত নতুন অভিযোগ সামনে আসায় বিদ্যালয়ের ভর্তি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিয়ে আবারও প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয় অভিভাবক ও সচেতন মহল দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন :
প্রতিবেদকের তথ্য
SHA.AZH

SHA.AZH

© স্বত্বাধিকারঃ যায়যায়দিন
কারিগরী সহযোগিতায় MULTISOFT