রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবিপ্রবি) নতুন উপ-উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) সমুদ্রবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মো. শফিকুল ইসলাম।
সোমবার (২৭ জুলাই) রাতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সহকারী সচিব শাহ আলম সিরাজের সই করা এক প্রজ্ঞাপনে তাকে এ নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তিনি আগামী চার বছর এ পদে দায়িত্ব পালন করবেন।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, মহামান্য রাষ্ট্রপতি ও চ্যান্সেলরের অনুমোদনক্রমে ‘রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০০১'-এর ১২ (১) ধারা অনুযায়ী অধ্যাপক ড. মো. শফিকুল ইসলামকে প্রো-ভিসি পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তিনি চ্যান্সেলরের আদেশে পাঁচ শর্তে প্রো-ভিসি পদে দায়িত্ব পালন করবেন।
নিয়োগের শর্তাবলিতে বলা হয়েছে, যোগদানের তারিখ থেকে তার নিয়োগের মেয়াদ চার বছর হবে। তবে অবসর গ্রহণের বয়সিআগে এলে সেই সময় পর্যন্তই তা কার্যকর থাকবে; তিনি তার মূল পদের সমপরিমাণ বেতন-ভাতাদি প্রাপ্য হবেন; বিধি অনুযায়ী পদসংশ্লিষ্ট অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা ভোগ করবেন এবং তাকে সার্বক্ষণিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অবস্থান করতে হবে; তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংবিধি ও আইন দ্বারা নির্ধারিত এবং ভাইস চ্যান্সেলর কর্তৃক প্রদত্ত ক্ষমতা প্রয়োগ ও দায়িত্ব পালন করবেন এবং মহামান্য রাষ্ট্রপতি ও চ্যান্সেলর প্রয়োজন মনে করলে যেকোনো সময় এ নিয়োগ বাতিল করতে পারবেন।
প্রফেসর ড. মো: শফিকুল ইসলাম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব মেরিন সায়েন্সেস-এর অধ্যাপক ও সমুদ্রবিজ্ঞানী। তিনি ইনস্টিটিউটটির পরিচালক (২০২০-২০২৩) এবং মেরিন সায়েন্সেস অ্যান্ড ফিশারিজ অনুষদের ডিন (২০২২-২০২৪) হিসেবে সফলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। পাশাপাশি তিনি সামাজিক সংগঠন 'অর্গানাইজেশন ফর ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট সোসাইটি' (ODMS)-এর চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
প্রসঙ্গত, ১৯৯৮ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব মেরিন সায়েন্সেস থেকে প্রথম শ্রেণিতে স্নাতক (সম্মান) ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে ২০০০ সালে একই প্রতিষ্ঠান থেকে 'এনভায়রনমেন্টাল পলিউশন' বিষয়ে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করে স্নাতকোত্তর (থিসিস) ডিগ্রি লাভ করেন। ২০১২ সালে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে "Ecological Aspects of benthic macrofauna of saltmarsh of Fauzderhat, Chittagong coast, Bangladesh" শীর্ষক থিসিসের ওপর 'মেরিন বায়োডাইভারসিটি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট' বিষয়ে ডক্টর অব ফিলোসফি (পিএইচডি) ডিগ্রি অর্জন করেন। এ সময় তিনি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গবেষণাগারে রিসার্চ ফেলো হিসেবে কাজ করেন। স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি গবেষণার জন্য তিনি দুইবার বাংলাদেশ সরকারের জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ফেলোশিপ লাভ করেন।
২০০৪ সালে প্রভাষক হিসেবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদানের মাধ্যমে তাঁর শিক্ষকতা জীবন শুরু হয়। পরবর্তীতে তিনি সহকারী অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক এবং ২০১৭ সালে অধ্যাপক পদে উন্নীত হন। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি সামুদ্রিক পরিবেশ, উপকূলীয় প্রতিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, ইকোসিস্টেম হেলথ অ্যাসেসমেন্ট, এনভায়রনমেন্টাল ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট (EIA), সামুদ্রিক দূষণ, মেরিন বায়োজিওকেমিস্ট্রি এবং পরিবেশ মহাসাগরবিদ্যা বিষয়ে শিক্ষা ও গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন।
প্রফেসর ড. মো: শফিকুল ইসলাম জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একজন সুপরিচিত গবেষক। তাঁর ১০০টিরও বেশি গবেষণা প্রবন্ধ বিশ্বের স্বনামধন্য আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। বাংলাদেশের উপকূলীয় পরিবেশ, লবণাক্ত জলাভূমি (Salt Marsh), সমুদ্রের উষ্ণায়ন ও অম্লায়ন, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য, দূষণ পর্যবেক্ষণ, সামুদ্রিক শৈবাল, আর্টেমিয়া, সামুদ্রিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে তিনি একাধিক গবেষণা প্রকল্প সফলভাবে পরিচালনা করেছেন। বিশ্ব ব্যাংক, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC), বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (BFRI), মৎস্য অধিদপ্তর এবং অন্যান্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে পরিচালিত বহু গবেষণা প্রকল্পে তিনি প্রধান গবেষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া তিনি 'বাংলাদেশ ফিশারিজ রিসার্চ ফোরাম' (BFRF)-এর আজীবন সদস্য এবং 'কোস্টাল অ্যান্ড ওশান রিসার্চ গ্রুপ' (CORG)-এর সাধারণ সম্পাদক হিসেবে যুক্ত রয়েছেন।
তিনি UNESCO-IOC, IUCN, BoBLME এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার বিভিন্ন প্রশিক্ষণ, কর্মশালা ও বৈজ্ঞানিক সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেছেন। ২০২৪ সালে ফ্রান্সের প্যারিসে UNESCO-IOC সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত Ocean Prediction Symposium-এ তাঁর অংশগ্রহণ আন্তর্জাতিক গবেষণা কার্যক্রমে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এছাড়া ২০১৫ সালে শ্রীলঙ্কার মাউন্ট লাভিনিয়ায় UNESCO/IOC/ICG/IOTWS আয়োজিত Coastal Hazard Assessment বিষয়ক আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ কর্মশালায় অংশগ্রহণ করেন। ২০১১ সালে থাইল্যান্ডের ফুকেটে অনুষ্ঠিত মৌসুমী বায়ু পর্যবেক্ষণ এবং এর সামাজিক ও প্রতিবেশগত প্রভাববিষয়ক আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ কর্মশালায় তিনি বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন।
প্রশাসনিক ক্ষেত্রেও তাঁর দীর্ঘ ও বিস্তৃত অভিজ্ঞতা রয়েছে। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব মেরিন সায়েন্সেস-এর পরিচালক, মেরিন সায়েন্সেস অ্যান্ড ফিশারিজ অনুষদের ডিন, সহকারী প্রক্টর (২০০৫-২০০৭), শাহ জালাল হলের হাউস টিউটর (২০০৪-২০০৫) এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ ও পরিকল্পনা কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া তিনি চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিম্যাল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয় (সিভাসু), মেহেরপুর বিশ্ববিদ্যালয় এবং জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য হিসেবেও নীতিনির্ধারণী ভূমিকা পালন করছেন।