ঢাকা | শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬ ইং | ২৫ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সাংবাদিকতার মর্যাদা রক্ষায় স্বাধীন গণমাধ্যম নীতিমালা অপরিহার্য

author
আহসান হাবিব বরুন

প্রকাশিত : ২৮ জুলাই, ২০২৬ দুপুর ৩:৪১
প্রতীকী ছবি প্রতীকী ছবি
ad003
রাষ্ট্রের সাংবিধানিক কাঠামো, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং আইনের শাসনের কার্যকারিতা অনেকাংশেই নির্ভর করে একটি স্বাধীন, দায়িত্বশীল ও বিশ্বাসযোগ্য গণমাধ্যমের ওপর। সংসদ আইন প্রণয়ন করে, বিচার বিভাগ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে এবং নির্বাহী বিভাগ রাষ্ট্র পরিচালনা করে; কিন্তু জনগণের পক্ষে এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার অন্যতম প্রধান মাধ্যম হলো সংবাদমাধ্যম। এ কারণেই বিশ্বজুড়ে স্বাধীন গণমাধ্যমকে রাষ্ট্রের ‘চতুর্থ স্তম্ভ’ (Fourth Estate) বলা হয়।

কিন্তু এই মর্যাদা কেবল একটি উপাধি নয়; এটি অর্জন করতে হয় দীর্ঘদিনের পেশাগত সততা, তথ্যনিষ্ঠতা, নৈতিকতা এবং জনস্বার্থে আপসহীন অবস্থানের মাধ্যমে। একইভাবে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কোনো সীমাহীন স্বাধীনতার নাম নয়; এটি স্বাধীনতা ও জবাবদিহির একটি ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক।

সম্প্রতি বাংলাদেশ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে ন্যাশনাল এডিটরস কাউন্সিলের নেতাদের বৈঠকে স্বাধীন গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের জন্য নীতিমালা প্রণয়নের কাজে সম্পাদকদের সহযোগিতা কামনা এবং সরকারের গঠনমূলক সমালোচনার পাশাপাশি ইতিবাচক কর্মকাণ্ডও তুলে ধরার আহ্বান বর্তমান সময়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বার্তা বহন করে। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে তা বাংলাদেশের গণমাধ্যম খাতে দীর্ঘদিনের অনেক কাঠামোগত সমস্যার সমাধানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।

বাংলাদেশে গণমাধ্যম আজ এক দ্বৈত সংকটের মুখোমুখি। একদিকে রয়েছে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষার প্রশ্ন, অন্যদিকে রয়েছে পেশাদার সাংবাদিকতার মান, নৈতিকতা এবং জনআস্থা পুনর্গঠনের চ্যালেঞ্জ। এই দুই সংকটের সমাধান একটি অপরটির বিকল্প নয়; বরং উভয়কেই সমান গুরুত্ব দিয়ে এগোতে হবে।

গত দুই দশকে প্রযুক্তির বিকাশ সংবাদ প্রকাশকে গণতান্ত্রিক করেছে। অনলাইন সংবাদমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের বিস্তার তথ্যপ্রবাহকে সহজ করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে এমন বহু অনিবন্ধিত বা অস্বচ্ছ প্ল্যাটফর্মও গড়ে উঠেছে, যেগুলোর সম্পাদকীয় নীতি, মালিকানা, অর্থায়ন কিংবা পেশাগত জবাবদিহি সম্পর্কে জনসাধারণের পরিষ্কার ধারণা নেই। এর ফলে অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত সাংবাদিকতা ও অপেশাদার তথ্যপ্রচারের মধ্যে পার্থক্য করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

এ বাস্তবতা কেবল বাংলাদেশের নয়; বিশ্বের বহু দেশ একই চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এর প্রভাব আরও গভীর, কারণ এখানে গণমাধ্যমের প্রতি জনগণের আস্থা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, সাংবাদিক পরিচয়ের অপব্যবহার নিয়ে জনপরিসরে দীর্ঘদিন ধরে নানা অভিযোগ উঠে আসছে। বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানেও সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার করে প্রতারণা, ব্ল্যাকমেইল বা অনৈতিক সুবিধা আদায়ের অভিযোগে কিছু ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে। তবে বিচ্ছিন্ন অপরাধের দায় পুরো সাংবাদিক সমাজের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যেমন অন্যায়, তেমনি এসব অনিয়মকে অস্বীকার করাও বাস্তবতাকে অস্বীকার করার শামিল।

একজন প্রকৃত সাংবাদিকের সবচেয়ে বড় পরিচয় তাঁর প্রেসকার্ড নয়; তাঁর সততা, দক্ষতা, তথ্য যাচাইয়ের সক্ষমতা এবং জনস্বার্থে কাজ করার মানসিকতা।

বাংলাদেশে অনেক মেধাবী সাংবাদিক দীর্ঘদিন ধরে সীমিত বেতন, অনিশ্চিত চাকরি এবং পেশাগত নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে কাজ করছেন। অন্যদিকে কিছু অস্বচ্ছ প্ল্যাটফর্মের দ্রুত বিস্তার পুরো পেশাটির ভাবমূর্তিকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে। এই বৈপরীত্য দূর করা এখন সময়ের দাবি।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পেশাজীবী সংগঠনগুলোর ভূমিকা। সাংবাদিকদের সংগঠনগুলো যদি সত্যিকার অর্থে পেশাগত মান উন্নয়ন, নৈতিকতা রক্ষা এবং সদস্যদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে, তাহলে গণমাধ্যমের প্রতি জনগণের আস্থা আরও শক্তিশালী হবে। সংগঠনগুলোকে রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে পেশার স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

স্বাধীন গণমাধ্যম নীতিমালার একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হওয়া উচিত সম্পাদকীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। কোনো সরকার, রাজনৈতিক দল, করপোরেট প্রতিষ্ঠান কিংবা প্রভাবশালী গোষ্ঠী যেন সংবাদ প্রকাশে অযৌক্তিক প্রভাব বিস্তার করতে না পারে। একই সঙ্গে সাংবাদিকদেরও তথ্য যাচাই, নিরপেক্ষতা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তার প্রতি সম্মান এবং নৈতিক আচরণবিধি কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে।
নীতিমালায় অন্তত কয়েকটি বিষয় অগ্রাধিকার পাওয়া প্রয়োজন।

প্রথমত, সাংবাদিক ও গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি স্বচ্ছ নিবন্ধন ও পরিচয় যাচাই ব্যবস্থা।

দ্বিতীয়ত, সাংবাদিকদের ন্যূনতম পেশাগত প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং নৈতিক আচরণবিধির কার্যকর বাস্তবায়ন।তৃতীয়ত, সংবাদকর্মীদের ন্যায্য বেতন, কর্মপরিবেশ ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

চতুর্থত, সম্পাদকীয় স্বাধীনতা এবং সংবাদ প্রকাশে রাজনৈতিক বা বাণিজ্যিক চাপ থেকে সুরক্ষা।

পঞ্চমত, সংবাদমাধ্যমের মালিকানা ও অর্থায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।ষষ্ঠত, ডিজিটাল যুগে ভুয়া তথ্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর বিভ্রান্তিমূলক কনটেন্ট এবং তথ্য-কারসাজি মোকাবিলায় আধুনিক নীতিমালা প্রণয়ন। সপ্তমত, স্বাধীন অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা, যাতে জনগণ ও সাংবাদিক—উভয়েই ন্যায়সঙ্গত প্রতিকার পেতে পারেন।

গণতন্ত্রে সরকারের ইতিবাচক কাজ তুলে ধরা যেমন সাংবাদিকতার দায়িত্ব, তেমনি ভুল সিদ্ধান্ত, দুর্নীতি, অনিয়ম ও জনভোগান্তির সমালোচনা করাও সমানভাবে সাংবাদিকতার মৌলিক কর্তব্য। কারণ সংবাদমাধ্যমের আনুগত্য কোনো সরকার বা দলের প্রতি নয়; তার আনুগত্য সত্য, সংবিধান এবং জনগণের জানার অধিকারের প্রতি।

ইতিহাস বলে, যে রাষ্ট্র সমালোচনাকে ভয় পায়, সে রাষ্ট্র ধীরে ধীরে আত্মসমালোচনার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলে। আবার যে গণমাধ্যম তথ্য যাচাই ছাড়া প্রচার চালায়, সেও নিজের বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়। তাই স্বাধীনতা ও দায়িত্ব—এই দুইয়ের সমন্বয়ই হতে পারে বাংলাদেশের গণমাধ্যমের ভবিষ্যৎ শক্তির ভিত্তি।

আজ বাংলাদেশের প্রয়োজন এমন একটি গণমাধ্যম নীতিমালা, যা সাংবাদিককে স্বাধীনভাবে সত্য প্রকাশের সাহস দেবে, একই সঙ্গে পেশার অপব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর জবাবদিহিও নিশ্চিত করবে। কারণ প্রেসকার্ড কখনোই অপরাধ আড়াল করার ঢাল হতে পারে না; আবার অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার কণ্ঠও কোনো অযৌক্তিক ভয় বা চাপে স্তব্ধ হয়ে যেতে পারে না।

পরিশেষে বলতে চাই,একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে স্বাধীন গণমাধ্যম জনগণের মৌলিক অধিকার রক্ষার অন্যতম প্রধান উপায়। সাংবাদিকতার মর্যাদা রক্ষা মানে কেবল একটি পেশার সম্মান রক্ষা নয়; এটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ভিত্তি, আইনের শাসন এবং নাগরিক আস্থাকে শক্তিশালী করারও অপরিহার্য শর্ত।

বাংলাদেশ যদি সত্যিকার অর্থে একটি জবাবদিহিমূলক, স্বচ্ছ ও আধুনিক রাষ্ট্রে পরিণত হতে চায়, তবে স্বাধীন, দায়িত্বশীল এবং পেশাদার গণমাধ্যম গড়ে তোলার বিকল্প নেই। আর সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য অংশগ্রহণমূলক, ভারসাম্যপূর্ণ ও যুগোপযোগী স্বাধীন গণমাধ্যম নীতিমালা প্রণয়ন এখন সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় প্রয়োজন।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
ই-মেইল: [email protected] 

সংবাদটি শেয়ার করুন :
প্রতিবেদকের তথ্য
SH.AL

SH.AL

© স্বত্বাধিকারঃ যায়যায়দিন
কারিগরী সহযোগিতায় MULTISOFT