মো. সাহাবুদ্দিনের প্রেসিডেন্টের পদ থেকে পদত্যাগের পর দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন সবচেয়ে আলোচিত বিষয় বাংলাদেশের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট কে হচ্ছেন। এ প্রশ্নের উত্তর খুজতেই শনিবার দলের সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠক ডেকেছে বিএনপি। দলীয় সূত্রগুলো বলছে, এই বৈঠকেই সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা শেষে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের রূপরেখা নির্ধারণ হতে পারে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির একাধিক সদস্যের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দলীয় চেয়ারম্যান তারেক রহমান কোনো একক সিদ্ধান্তে যেতে চান না। বরং, দলের সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী ফোরামের সদস্যদের মতামত নিয়েই প্রার্থী নির্ধারণ করা হবে।
গত শুক্রবার (২৪ জুলাই) ‘শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা’ না থাকার কারণ দেখিয়ে প্রেসিডেন্টের পদ থেকে সরে দাড়ান মো. সাহাবুদ্দিন। তার পদত্যাগের পর সংবিধান অনুযায়ী, ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ। এ অবস্থায় নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা আরো জোরালো হয়েছে।
স্থায়ী কমিটির বৈঠকেই নির্ধারণ হবে দিকনির্দেশনা
বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক জন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে যায়যায়দিনকে বলেন, নতুন প্রেসিডেন্ট নিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে যেমন আলোচনা চলছে, তেমনি দলের ভেতরও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান এককভাবে কোনো সিদ্ধান্ত দেবেন না। স্থায়ী কমিটির সভায় সবার মতামত নেয়া হবে। সেই মতামতের ভিত্তিতেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে।’
স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য জানান, শনিবারের বৈঠকের অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয়ই হবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। সম্ভাব্য প্রার্থীদের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা, সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা, অভিজ্ঞতা এবং বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা সবকিছু বিবেচনায় রেখেই আলোচনা হবে।
আলোচনায় যাদের নাম
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন- স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, নজরুল ইসলাম খান, আব্দুল মঈন খান এবং ভাইস চেয়ারম্যান আলতাফ হোসেন চৌধুরী। এ ছাড়া অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ, এক জন সাবেক সচিব এবং কয়েক জন ইউনিভার্সিটির শিক্ষকের নামও আলোচনায় এসেছে। রাজনৈতিক মহলে অন্তর্র্বর্তী সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নাম নিয়েও আলোচনা রয়েছে।
ফখরুল না হাফিজ উদ্দিন কার পাল্লা ভারী
নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নিয়ে বিএনপির ভেতর আলোচনা নতুন নয়। ফেব্রুয়ারির পার্লামেন্ট ইলেকশনে জয়ী হয়ে সরকার গঠনের পর থেকেই দলটির নেতা-কর্মীদের মধ্যে এ বিষয়ে কৌতূহল ছিল। কারণ, আওয়ামী লীগ আমলে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতিকে বিএনপি বহাল রাখবে না, এমন ধারণা আগে থেকেই ছিল। প্রশ্ন ছিল, পরিবর্তনের উদ্যোগ কবে নেয়া হবে। পদত্যাগের মাধ্যমে সেই পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় এখন সিদ্ধান্তের দায়িত্ব পুরোপুরি বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর।
দলীয় নেতা-কর্মীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে, বর্তমান স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ এবং দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে ঘিরে। অনেকের মতে, পঞ্চম পার্লামেন্টের স্পিকার আব্দুর রহমান বিশ্বাস পরে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন। সেই নজির বিবেচনায় সাতবারের এমপি হাফিজ উদ্দিন আহমেদও প্রেসিডেন্ট পদে শক্তিশালী প্রার্থী হতে পারেন।
আবার প্রধান মন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পর দলের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে বিবেচিত হন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। প্রায় দেড় দশক আওয়ামী লীগ বিরোধী আন্দোলনের কঠিন সময় তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন। অন্তর্র্বর্তী সরকারের সময়ও জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতি সামলেছেন দক্ষতার সঙ্গে।
ঠাকুরগাঁওয়ের তৃণমূল রাজনীতি থেকে উঠে আসা মির্জা ফখরুল ২০০১ সালে চারদলীয় জোট সরকারের কৃষি প্রতি মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে বিএনপির দুঃসময় ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করে দলের আস্থা অর্জন করেন। ২০১৬ সালের কাউন্সিলে তিনি মহাসচিব নির্বাচিত হন। এরপর থেকে দল পরিচালনায় তার ভূমিকা নিয়ে দলীয় পর্যায়ে সন্তুষ্টি রয়েছে। জেল-জুলুম ও নির্যাতনের সময় দলের পাশে থাকার কারণেও হাই কমান্ডের কাছে তার প্রতি বিশেষ আস্থা তৈরি হয়েছে।
দলীয় সূত্র বলছে, প্রেসিডেন্ট পদ দিয়ে তাকে সম্মানিত করার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে। পাশাপাশি, রাজনৈতিক সংকট দেখা দিলে এক জন অভিজ্ঞ রাজনীতিক হিসেবে তিনি প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন এমন মূল্যায়নও রয়েছে দলের একাংশে। প্রেসিডেন্ট হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যায়যায়দিনকে বলেন, দেশের সংবিধান অনুযায়ী দল যে সিদ্ধান্ত নেবে, সেটিই চূড়ান্ত। তবে দলের আরেকটি অংশ মনে করে, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় তার সক্রিয় দলীয় রাজনীতিতে থাকাই বেশি প্রয়োজন।
আইরিন খানকে নিয়েও আলোচনা
সম্প্রতি জাতি সংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ও এম্বাসাডর হিসেবে নিয়োগ পাওয়া আইরিন খানের নামও বিএনপির নেতা-কর্মীদের আলোচনায় এসেছে। প্রধান মন্ত্রীর আত্মীয় হওয়ায় তাকে ঘিরেও বিভিন্ন গুঞ্জন রয়েছে রাজনৈতিক অঙ্গনে।
বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল যায়যায়দিনকে বলেন, রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক দুই ধরনের ব্যক্তিকেই অতীতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের অভিজ্ঞতা বিএনপির রয়েছে। তিনি আশা করেন, দলের শীর্ষ নেতৃত্ব সেই অভিজ্ঞতা ও বর্তমান বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই সিদ্ধান্ত নেবে।
প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সাংবিধানিক বিধান
১৯৯১ সালে সংসদীয় শাসন ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের পর থেকে প্রেসিডেন্ট আর সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন না। বর্তমানে এমপিদের ভোটে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। রাষ্ট্র প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও নির্বাহী ক্ষমতা প্রধান মন্ত্রীর হাতেই ন্যস্ত থাকে।
সংবিধানের ৫০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রেসিডেন্টের মেয়াদ পাচ বছর এবং কোনো ব্যক্তি দুইবারের বেশি এই পদে থাকতে পারেন না। মেয়াদ শেষ, পদত্যাগ অথবা অভিশংসনের মাধ্যমে পদ শূন্য হলে ইলেকশন কমিশন নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের উদ্যোগ নেয়। প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থী হতে হলে বয়স কমপক্ষে ৩৫ বছর হতে হবে এবং এমপি নির্বাচিত হওয়ার যোগ্যতা থাকতে হবে।
ইলেকশন কমিশন স্পিকারের সঙ্গে পরামর্শ করে তফশিল ঘোষণা করে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে। সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, মেয়াদ শেষ হওয়ার কারণে প্রেসিডেন্টের পদ শূন্য হলে মেয়াদ শেষ হওয়ার ৯০-৬০ দিনের মধ্যে নির্বাচন আয়োজন করতে হয়। কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী না থাকলে প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। তফশিল ঘোষণার পর পার্লামেন্ট অধিবেশন চলাকালীন ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। তবে সে সময় পার্লামেন্টের অধিবেশন না থাকলে ইলেকশন কমিশনের পরামর্শে স্পিকার প্রজ্ঞাপন জারি করে ভোটের কমপক্ষে সাত দিন আগে অধিবেশন আহ্বান করেন।
প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে ঘিরে এখন রাজনৈতিক অঙ্গনের দৃষ্টি শনিবারের স্থায়ী কমিটির বৈঠকের দিকে। কারণ, সেখান থেকেই দেশের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন বিষয়ে বিএনপির আনুষ্ঠানিক অবস্থান স্পষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।