বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আসন্ন ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দেওয়ার জন্য ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণ নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ঘটনা। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রতিটি আমন্ত্রণেরই একটি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত বার্তা থাকে। বিশেষ করে যখন সেই আমন্ত্রণ আসে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনৈতিক জোট ব্রিকসকে ঘিরে এবং দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম প্রতিবেশী ভারতের পক্ষ থেকে, তখন বিষয়টি আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশের উচিত হবে এই আমন্ত্রণকে কেবল একটি আনুষ্ঠানিক সফরের দৃষ্টিতে না দেখে, বরং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সুযোগ, আঞ্চলিক ভারসাম্য এবং বহুমুখী কূটনীতির অংশ হিসেবে বিবেচনা করা। কারণ বর্তমান বিশ্বের বাস্তবতা হলো—কোনো দেশ একক শক্তির ওপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারে না। বরং বিভিন্ন শক্তিকেন্দ্রের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্কই এখন সফল পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি।
বিশ্ব অর্থনীতির মানচিত্রে ব্রিকসের গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকার উদ্যোগে যাত্রা শুরু করলেও পরবর্তীকালে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরান, মিসর, ইথিওপিয়া, ইন্দোনেশিয়াসহ নতুন দেশ যুক্ত হওয়ায় জোটটির প্রভাব আরও বিস্তৃত হয়েছে। বৈশ্বিক জিডিপি, জনসংখ্যা, জ্বালানি সম্পদ, শিল্প উৎপাদন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বড় একটি অংশ এখন ব্রিকসভুক্ত দেশগুলোর নিয়ন্ত্রণে। ফলে ভবিষ্যতের বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এই জোটের ভূমিকা আরও শক্তিশালী হবে বলেই অধিকাংশ বিশ্লেষক মনে করেন।
বাংলাদেশ এখনও ব্রিকসের সদস্য নয়। তবে সদস্য না হয়েও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে জোটটির সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার সুযোগ রয়েছে। ব্রিকস সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতি সেই সুযোগকে আরও প্রসারিত করতে পারে। সম্মেলনের মূল অধিবেশনের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের সুযোগ তৈরি হয়। অনেক সময় এসব বৈঠকেই বড় বিনিয়োগ, অবকাঠামো সহযোগিতা, বাণিজ্য সম্প্রসারণ কিংবা নতুন অর্থনৈতিক উদ্যোগের ভিত্তি গড়ে ওঠে।
বাংলাদেশ বর্তমানে একটি পরিবর্তনশীল অর্থনীতির মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে। উন্নয়ন অব্যাহত রাখতে বিদেশি বিনিয়োগ, রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ, প্রযুক্তি সহযোগিতা এবং উন্নয়ন অর্থায়নের নতুন উৎস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্রিকসভুক্ত দেশগুলোর সম্মিলিত অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাংলাদেশের জন্য এসব ক্ষেত্রেই নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে। বিশেষ করে ব্রিকসের নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ভবিষ্যৎ সহযোগিতার সুযোগও দীর্ঘমেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
এই সফরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক। ভৌগোলিক বাস্তবতা কখনো পরিবর্তন করা যায় না। ইতিহাস, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, নদী, সীমান্ত, নিরাপত্তা এবং যোগাযোগ—সবকিছুতেই দুই দেশের পারস্পরিক নির্ভরশীলতা রয়েছে। ফলে রাজনৈতিক মতপার্থক্য বা সাময়িক উত্তেজনা থাকলেও সম্পর্ক পুরোপুরি উপেক্ষা করার সুযোগ কোনো পক্ষেরই নেই।
এটাও সত্য যে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতকে ঘিরে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে নানা প্রশ্ন ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। সীমান্তে প্রাণহানি, তিস্তার পানিবণ্টন, বাণিজ্য বৈষম্য, কিছু রাজনৈতিক অবস্থান এবং পারস্পরিক সংবেদনশীল ইস্যুতে ভারতের ভূমিকা নিয়ে দেশে সমালোচনা রয়েছে। এসব উদ্বেগ বাস্তব এবং এগুলো নিয়ে বাংলাদেশের দৃঢ় অবস্থান থাকা উচিত। জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে আপস করার কোনো সুযোগ নেই।
তবে একই সঙ্গে এটাও মনে রাখতে হবে, কূটনীতির সবচেয়ে কার্যকর পথ হলো সংলাপ। কথা না বললে সমস্যার সমাধান হয় না; বরং দূরত্ব বাড়ে। প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ যত বেশি হবে, ভুল বোঝাবুঝি কমার সম্ভাবনাও তত বাড়বে। সম্পর্ক ভালো রাখা মানে নিজের স্বার্থ বিসর্জন দেওয়া নয়; বরং নিজের স্বার্থ আরও কার্যকরভাবে তুলে ধরার সুযোগ সৃষ্টি করা।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি অনেক আগেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন বলে জানা যায়। বিভিন্ন কারণে সেই সফর এখনও বাস্তবায়িত হয়নি। ব্রিকস সম্মেলনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে যদি দুই নেতার মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, তাহলে সেটি উভয় দেশের জন্যই ইতিবাচক বার্তা বহন করবে। আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় সফরের বাইরে আন্তর্জাতিক সম্মেলনের ফাঁকে অনুষ্ঠিত বৈঠক অনেক সময় জটিল বিষয়েও অগ্রগতির পথ তৈরি করে।
এমন বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সীমান্ত হত্যা বন্ধ, তিস্তা চুক্তি, বাণিজ্য ভারসাম্য, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সহযোগিতা, আঞ্চলিক যোগাযোগ, ট্রানজিট, বিনিয়োগ এবং মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো জোরালোভাবে তুলে ধরা যেতে পারে। একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ সম্পর্ক কোন ভিত্তির ওপর দাঁড়াবে, সে বিষয়েও স্পষ্ট বার্তা দেওয়ার সুযোগ থাকবে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম শক্তি হলো ভারসাম্য রক্ষা। একদিকে চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, অন্যদিকে ভারতের সঙ্গে ভৌগোলিক ও কৌশলগত সম্পর্ক, পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, মধ্যপ্রাচ্য এবং আসিয়ান দেশগুলোর সঙ্গে ক্রমবর্ধমান অংশীদারিত্ব—সব মিলিয়ে বাংলাদেশ বহু বছর ধরেই একটি ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক অবস্থান ধরে রেখেছে। এই নীতি ভবিষ্যতেও বজায় রাখা জরুরি।
বর্তমান বিশ্ব ক্রমেই বহুমেরুকেন্দ্রিক হয়ে উঠছে। একসময় যেখানে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কয়েকটি শক্তির প্রভাবই ছিল নিরঙ্কুশ, এখন সেখানে নতুন নতুন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক জোট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ব্রিকস সেই পরিবর্তনের অন্যতম প্রতীক। ফলে এই প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশের সক্রিয় উপস্থিতি আন্তর্জাতিক পরিসরে দেশের গ্রহণযোগ্যতা ও কূটনৈতিক পরিধি আরও বিস্তৃত করতে পারে।
বিশেষভাবে উল্লেখ করা দরকার, বাংলাদেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ অনেকাংশে রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং নতুন বাজার তৈরির ওপর নির্ভর করবে। বর্তমানে তৈরি পোশাক খাতের পাশাপাশি ওষুধ, চামড়াজাত পণ্য, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য, হালকা প্রকৌশল এবং জাহাজ নির্মাণ শিল্পের জন্য নতুন বাজার খুঁজে বের করা জরুরি। ব্রিকসভুক্ত দেশগুলোর বিশাল বাজার এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
এছাড়া বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা, জ্বালানি নিরাপত্তা, খাদ্য নিরাপত্তা এবং স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্যের মতো বিষয়গুলোও এখন আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। ব্রিকসের সদস্য দেশগুলো এসব ক্ষেত্রে বিকল্প কাঠামো নিয়ে কাজ করছে। বাংলাদেশ যদি এসব আলোচনা কাছ থেকে অনুসরণ করতে পারে এবং সম্ভাব্য সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করতে পারে, তাহলে ভবিষ্যতে দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা আরও শক্তিশালী হবে।
অবশ্য ব্রিকসকে ঘিরে অতিরিক্ত প্রত্যাশা তৈরি করাও ঠিক হবে না। কোনো আন্তর্জাতিক জোটই একা একটি দেশের সব সমস্যার সমাধান করে দিতে পারে না। শেষ পর্যন্ত জাতীয় স্বার্থ রক্ষা, অর্থনৈতিক সংস্কার, সুশাসন এবং অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা বৃদ্ধিই উন্নয়নের মূল ভিত্তি। আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম কেবল সেই অগ্রযাত্রাকে আরও গতিশীল করতে সাহায্য করে।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—যেখানেই যাওয়া হোক, যে প্ল্যাটফর্মেই অংশগ্রহণ করা হোক, সব সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে থাকতে হবে দেশের জাতীয় স্বার্থ। বন্ধুত্ব সবার সঙ্গে, কিন্তু নির্ভরতা কারও ওপর নয়—এই নীতিই আমাদের কূটনীতির শক্তি হওয়া উচিত।
ব্রিকস সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণ যদি বাস্তবায়িত হয়, তাহলে সেটি কেবল একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে উপস্থিতি হবে না; বরং অর্থনৈতিক সম্ভাবনা অনুসন্ধান, বহুমুখী কূটনীতি শক্তিশালী করা, প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা এগিয়ে নেওয়া এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করার একটি বাস্তব সুযোগ হয়ে উঠতে পারে।
পররাষ্ট্রনীতিতে আবেগের চেয়ে বাস্তবতা গুরুত্বপূর্ণ। আর বাস্তবতা বলছে, আজকের পৃথিবীতে কূটনৈতিক সংলাপ, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব—এই তিনটির বিকল্প নেই। বাংলাদেশের উচিত সেই বাস্তবতাকে সামনে রেখেই প্রতিটি আন্তর্জাতিক সুযোগকে জাতীয় উন্নয়নের সোপানে পরিণত করার চেষ্টা করা।
লেখক: সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।