ঢাকা | বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬ ইং | ২৩ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শ্রমশক্তি রপ্তানি নয়, মানবসম্পদ কূটনীতি: বাংলাদেশি অভিবাসন বৃদ্ধিতে কূটনৈতিক মিশনের ভূমিকা

author
ব্যারিস্টার মির্জা জিল্লুর রহমান

প্রকাশিত : ২ আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৯:৩২
ad003
আজকের বিশ্বে অভিবাসন শুধু ভিসা বা বিমানবন্দরের বিষয় নয়; এটি অর্থনীতি, কূটনীতি, শ্রমবাজার, মানবাধিকার এবং রাষ্ট্রের বৈশ্বিক অবস্থানের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। বাংলাদেশ প্রতি বছর লাখ লাখ দক্ষ, অদক্ষ ও স্বল্পদক্ষ কর্মী বিদেশে পাঠায়।
 
তাদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আজও রয়ে গেছে: বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশি দূতাবাস ও হাইকমিশনগুলো কি আমাদের বৈধবিশ্বজুড়ে বাংলাদেশি দূতাবাস ও হাইকমিশনগুলো কি আমাদের বৈধ শ্রম অভিবাসন বৃদ্ধিতে তাদের পূর্ণ দায়িত্ব পালন করছে?

অনেকের ধারণা, কূটনৈতিক মিশনের কাজ কেবল পাসপোর্ট নবায়ন, ভিসা সহায়তা বা কনস্যুলার সেবা দেওয়া। বাস্তবে এর পরিধি অনেক বড়। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় দূতাবাস হচ্ছে অর্থনৈতিক ও মানবসম্পদ কূটনীতির অগ্রবর্তী প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এটি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আমাদের সবচেয়ে বড় বৈদেশিক সম্পদ হলো আমাদের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী।

নতুন শ্রমবাজার খোঁজা কূটনৈতিক দায়িত্ব দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ প্রধানত মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর শ্রমবাজারের ওপর নির্ভরশীল। অথচ ইউরোপ, পূর্ব এশিয়া, আফ্রিকা এবং কিছু ল্যাটিন আমেরিকান দেশেও শ্রমঘাটতি বাড়ছে। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, পোল্যান্ড, রোমানিয়া, হাঙ্গেরি, ক্রোয়েশিয়া, সার্বিয়া, গ্রিস, ইতালি, মাল্টা, লিথুয়ানিয়া ও অন্যান্য দেশে নির্মাণ, কৃষি, পরিচর্যা, উৎপাদন, লজিস্টিকস ও সেবাখাতে কর্মীর চাহিদা রয়েছে।

প্রতিটি বাংলাদেশি মিশনের উচিত স্থানীয় সরকার, চেম্বার অব কমার্স, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও নিয়োগকারী সংস্থার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে নতুন সুযোগ চিহ্নিত করা। শুধু সমস্যা সমাধান নয়, **কর্মসংস্থান সৃষ্টি করাওকর্মসংস্থান সৃষ্টি করাও কূটনৈতিক দায়িত্বের অংশ হওয়া উচিত।

দক্ষতা অনুযায়ী পরিকল্পনা জরুরি: বাংলাদেশ এখনও বিপুলসংখ্যক অদক্ষ শ্রমিক পাঠায়। এতে আয় কম হয় এবং ঝুঁকি বেশি থাকে। দূতাবাসগুলো যদি নিয়মিতভাবে জানায় কোন দেশে কোন দক্ষতার চাহিদা বাড়ছে, তাহলে বাংলাদেশে সেই অনুযায়ী প্রশিক্ষণ দেওয়া সম্ভব।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়: জাপানে কেয়ারগিভার ও টেকনিক্যাল ট্রেইনি দক্ষিণ কোরিয়ায় উৎপাদন ও মেশিন অপারেশন ইউরোপে কৃষি, নির্মাণ ও বৃদ্ধসেবা মধ্যপ্রাচ্যে সুপারভাইজরি ও টেকনিক্যাল কাজ সামুদ্রিক ও জাহাজ নির্মাণ খাতে বিশেষ দক্ষতা দূতাবাসের পাঠানো তথ্য যদি জনশক্তি মন্ত্রণালয়, কারিগরি শিক্ষা বোর্ড ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবহার করে, তাহলে অভিবাসনের মান বদলে যেতে পারে।

প্রবাসীদের হয়রানি: গ্রহণযোগ্য নয়-  গত দশ বছরে হাজার হাজার প্রবাসী অভিযোগ করেছেন যে বিদেশে যেমন প্রতারণার শিকার হন, তেমনি দেশে ফেরার পরও অনেক সময় বিমানবন্দরে অপ্রয়োজনীয় জিজ্ঞাসাবাদ, দীর্ঘ অপেক্ষা, লাগেজ নিয়ে জটিলতা এবং অসৌজন্যমূলক আচরণের মুখোমুখি হন। অবশ্যই নিরাপত্তা যাচাই প্রয়োজন, কিন্তু সাধারণ প্রবাসীকে সন্দেহভাজন অপরাধীর মতো আচরণ করা কোনো সভ্য প্রশাসনের পরিচয় হতে পারে না।

যিনি বিদেশে শ্রম দিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা পাঠান, তাকে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সম্মান দেওয়া উচিত। বিমানবন্দর হবে সেবার স্থান, হয়রানির নয়। বিদেশে শ্রমিকের অধিকার রক্ষায় দূতাবাস কতটা সক্রিয়?

অসংখ্য বাংলাদেশি শ্রমিকের পাসপোর্ট আটকে রাখা, বেতন না দেওয়া, অতিরিক্ত কাজ করানো, নির্যাতন, অবৈধ আটক বা চুক্তিভঙ্গের ঘটনা ঘটে। অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিকরা দূতাবাসে গিয়ে দ্রুত সহায়তা পান না বলে অভিযোগ করেন।

প্রতিটি মিশনে শক্তিশালী **LabLabour Welfare Wing থাকা প্রয়োজন। সেখানে থাকতে হবে: ২৪ ঘণ্টার জরুরি হটলাইন বাংলা ভাষাভাষী সহায়ক কর্মকর্তা আইনি পরামর্শ আশ্রয় ও নিরাপত্তা সহায়তা মৃত ও আহত শ্রমিকের পরিবারকে সহায়তা একজন শ্রমিক বিদেশে অসহায় বোধ করলে রাষ্ট্রের উপস্থিতি তার কাছে দূতাবাসের মাধ্যমেই প্রকাশ পায়।

দালালচক্র বন্ধে কূটনৈতিক উদ্যোগ:  বাংলাদেশে বৈধ অভিবাসনের সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হলো দালাল ও প্রতারণা চক্র। অনেক কর্মী ভুয়া ভিসা, ভুয়া চাকরি বা অতিরিক্ত খরচের ফাঁদে পড়ে সর্বস্ব হারান। দূতাবাসগুলো অনুমোদিত নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের তালিকা প্রকাশ, ভিসা যাচাইয়ের ডিজিটাল ব্যবস্থা এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যৌথ অভিযান পরিচালনা করতে পারে।

বৈধ অভিবাসন সহজ না হলে অবৈধ অভিবাসন বাড়বেই। মানবসম্পদ কূটনীতিতে বাংলাদেশ পিছিয়ে কেন?

ফিলিপাইন বহু বছর ধরে সংগঠিতভাবে নার্স, কেয়ারগিভার ও পেশাজীবী পাঠাচ্ছে। ভারত আইটি, স্বাস্থ্যসেবা ও উচ্চদক্ষ কর্মী পাঠিয়ে বৈশ্বিক প্রভাব তৈরি করেছে। ভিয়েতনাম ও নেপালও শ্রমবাজার ব্যবস্থাপনায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি করেছে।

বাংলাদেশ এখনও অনেক ক্ষেত্রে “কম খরচের শ্রমিক সরবরাহকারী দেশ” হিসেবে পরিচিত। এই ভাবমূর্তি বদলাতে হলে আমাদের লক্ষ্য হতে হবে **বিশ্বস্ত, প্রশিক্ষিত ও দক্ষবিশ্বস্ত, প্রশিক্ষিত ও দক্ষ মানবসম্পদ সরবরাহকারী দেশ হওয়া।

কী করা উচিত?

আমি মনে করি সরকার অবিলম্বে নিম্নলিখিত পদক্ষেপ নিতে পারে: প্রতিটি দূতাবাসে Labour Market Intelligence Cell গঠন স্থানীয় শ্রমবাজার বিশ্লেষণ ও নতুন সুযোগ শনাক্তকরণের জন্য। ডিজিটাল জব ও ভিসা ভেরিফিকেশন প্ল্যাটফর্ম চালু প্রতারণা কমাতে এবং স্বচ্ছতা বাড়াতে। প্রবাসী অভিযোগের সময়সীমাবদ্ধ নিষ্পত্তি নির্দিষ্ট দিনের মধ্যে প্রতিকার নিশ্চিত করতে। দক্ষতা সনদের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন বাংলাদেশি প্রশিক্ষণের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে। নারী কর্মীদের জন্য বিশেষ সুরক্ষা ইউনিট গৃহকর্মী ও ঝুঁকিপূর্ণ খাতে কর্মরত নারীদের নিরাপত্তার জন্য। বিমানবন্দরে প্রবাসীবান্ধব করিডর দ্রুত, সম্মানজনক ও প্রযুক্তিনির্ভর সেবা নিশ্চিত করতে। প্রতি ছয় মাসে বৈশ্বিক শ্রমবাজার প্রতিবেদন প্রকাশ নীতি নির্ধারণে বাস্তব তথ্য ব্যবহারের জন্য।

বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশনগুলোকে কেবল প্রশাসনিক অফিস হিসেবে দেখার সময় শেষ। এগুলো হতে হবে **কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী, প্রবাসী সুরক্ষাকারী, বিনিয়োকর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী, প্রবাসী সুরক্ষাকারী, বিনিয়োগ আকর্ষণকারী এবং মানবসম্পদ কূটনীতির কেন্দ্রবিন্দু।

একজন বাংলাদেশি শ্রমিক বিদেশে শুধু রেমিট্যান্স পাঠান না, তিনি বাংলাদেশের সুনাম বহন করেন। তাকে নিরাপদ, বৈধ, মর্যাদাপূর্ণ ও দক্ষ অভিবাসনের সুযোগ দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আর সেই দায়িত্ব পালনে বিশ্বের প্রতিটি বাংলাদেশি দূতাবাস ও হাইকমিশনকে আরও সক্রিয়, জবাবদিহিমূলক ও ফলাফলমুখী হতে হবে।

বাংলাদেশ যদি আগামী দশকে অর্থনৈতিকভাবে আরও শক্তিশালী হতে চায়, তবে আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ হবে না শুধু প্রবাসী শ্রমিকের সংখ্যা, বরং **দক্ষ, সুরক্ষিত ও সম্মানজনক বৈশ্বিক বাংলাদেশদক্ষ, সুরক্ষিত ও সম্মানজনক বৈশ্বিক বাংলাদেশি কর্মশক্তি।



লেখক পরিচিতি -
ব্যারিস্টার মির্জা জিল্লুর রহমান 
আইনজীবী 
গণমাধ্যম বিশ্লেষক ও কূটনৈতিক বিষয়ক গবেষক।
সংবাদটি শেয়ার করুন :
প্রতিবেদকের তথ্য
SHA.AZH

SHA.AZH

© স্বত্বাধিকারঃ যায়যায়দিন
কারিগরী সহযোগিতায় MULTISOFT