ঢাকা | বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৬ ইং | ২২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ফুলবাড়িয়ায় নিখোঁজের ১০ দিন পর কাস্টমস সিপাহীর লাশের ১৫ টুকরো উদ্ধার

author
ফুলবাড়িয়া (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি

প্রকাশিত : ২ আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১:৩০
ad003
নিখোঁজের দশ দিন পর বাড়ির পাশে পরিত্যক্ত পুকুর থেকে তিনটি ট্রাভেল ব্যাগে কাস্টমসের সিপাহী আবু রায়হান তালুকদারের লাশের ১৫ টুকরো উদ্বার করেছে পুলিশ।

গতকাল রবিবার বিকেলে ফুলবাড়িয়া উপজেলার এনায়েতপুর ইউনিয়নের সোয়াইতপুর উত্তর পাড়া গ্রামে নিজ বাড়ির পাশে দীর্ঘদিনের পরিত্যক্ত পুকুর থেকে উদ্ধারকৃত তিনটি ট্রাভেল ব্যাগে খন্ডিত মরদেহ পাওয়া যায়। সে নিখোঁজের তিন দিন পর থেকে তার বাড়ির কেয়ারটেকার রাজু ও তার বন্ধু জিতুল এলাকা ছেড়ে গাঢাকা দিয়েছেন। তারা দু’জনেই মাদকাসক্ত। পুলিশের ভাষ্য, পরিকল্পিত ভাবে ৭ থেকে ৮ দিন আগে তাকে হত্যা করা হয়েছে। হত্যার পর ঘাতকরা তার হাত, পা, মস্তক, কোমড়সহ দেহ ১৫ টি অংশ আলাদা করে। পরে তিনটি ট্রাভেল ব্যাগে ভরে বাড়ির পাশে নির্ঝন এলাকায় একটি পরিত্যক্ত পুকুরে ফেলে রাখে। লাশ উদ্ধারের পর আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর একাধিক দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। সন্ধ্যা সাড়ে ৬ টায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।

সোয়াইতপুর  গ্রামের মৃত আবু বকর সিদ্দিক তালুকদারের কনিষ্ঠ পুত্র আবু রায়হান তালুকদার (৪০)। সে বাংলদেশ কাস্টম হাউজ কমলাপুরে সিপাহী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। গতকাল সকালে পুলিশের উর্দ্ধতন কর্মকর্তারা রায়হানের বাড়িতে যায়। ঘটনা দশ দিন অতিবাহিত ও কেয়ারটেকার পলাতক থাকায় পুলিশের সন্দেহ বাড়ে। বাড়ির আশপাশে ঝোপঝাপড়া, পুকুর ও খাল বিলে খোঁজ নিতে বলেন স্বজনদের। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে ফিরে আসার পথিমধ্যে স্থানীয়রা খবর দেয় বাড়ির পূর্ব পাশে একটি পরিত্যক্ত পুকুরে দুটি কালো ও একটি আকাশি রঙের তিনটি ট্রাভেল ব্যাগ ভাসতে দেখা যাচ্ছে। পুলিশ গিয়ে স্থানীয়দের সহায়তা পুকুর থেকে ব্যাগ তিনটি উপরে উঠালে দুগর্ন্ধ ছড়ায়। খোলার পর ব্যাগের ভিতরে টুকরো টুকরো লাশের খন্ডিত অংশ দেখা যায়।

পুলিশ ও নিহতের পরিবার সুত্রে জানাগেছে, প্রায় ১৭ বছর আগে বাংলদেশ কাস্টমস এক্সাইজ ও ভ্যাট দপ্তরে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী হিসেবে যোগদান করেন আবু রায়হান তালুকদার। পদোন্নতি পেয়ে সিপাহী হয়। বর্তমান কর্মরত কাস্টম হাউজ কমলাপুর। গত বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) রাতে নিজ কর্মস্থল থেকে বাড়িতে আসেন আবু রায়হান তালুকদার। বাড়ির কেয়ারটেকার রাজুকে নিয়ে রাতে নিজ ঘরে অবস্থান করছিলেন। পরের দিন শুক্রবার কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার উদ্যেশে বাড়ি থেকে নিয়ে যায় রাজু। দুই দিন পর সোমবার তার অফিসের এক সহকর্মী তার চাচাতো বোন প্রভাষক নাজমুন্নাহার বিউটি কে মোবাইল ফোনে জানান আবু রায়হান অফিসে আসেননি। তার ব্যবহৃত মুঠোফোনটিও বন্ধ রয়েছে। এরপর থেকে আত্মীয় স্বজনরা বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুজি শুরু করেন। কোথাও সন্ধান না পেয়ে ২৭ জুলাই রাতে আবু রায়হানের বড় ভাই মো. নূরুল ইসলাম ছোট ভাই নিখোঁজ উল্লেখ করে ফুলবাড়িয়া থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি)করেছেন। পরের দিন জিডির তদন্ত করতে গিয়ে পুলিশ জানতে পারে তার কেয়ারটেকার রাজু ও তার বন্ধু জিতুল এলাকা থেকে গা ঢাকা দিয়েছেন। আবু রায়হান তালুকদারের বাড়ি থেকে প্রায় ৭ কিলোমিটার দূর পাশ^বর্তি রাঙ্গামাটিয়া ইউনিয়নের অনন্তপুর গ্রামের ফজলু মির্জার ছেলে কেয়ারটেকার রাজু। রাজুর বন্ধুদের তথ্যের ভিত্তিতে তার বাড়ির পাশে বাজুয়া নদী থেকে স্থানীয় ডুবুরি দিয়ে গত মঙ্গলবার দুপুরে নিহত রায়হানের বাসার চাবির ছড়া উদ্ধার করে পুলিশ। থানায় জিডি করার ৬ দিন পর গতকাল অর্ধগলিত বিখন্ডিত লাশে মিললো কস্টমসের সিপাহী আবু রায়হানের। ছেলের লাশ পাওয়ার খবরে অশীতিপর মা রাহেলা খাতুন ও স্বজনদের কান্নায় গ্রামের বাতাসে ভেসেছে বেদনার ক্ষত। পরিবারের সবাই বাকরুদ্ধ। কারও সন্তনা তারা মেনে নিতে পারছেনা। তাদের প্রশ্ন কি এমন অপরাধ ছিল রায়হানের ? যে নির্মম ভাবে হত্যা করে শরীরের অংশ গুলো টুকরো টুকরো করা হলো ?

পরিবার ও স্থানীয়দের সাথে কথা বলে আরও জানাগেছে, ২০১৬ সালে মাঝামাঝি  পাশের আছিম পাটুলী ইউনিয়নের পাটুলী গ্রামে সুরাইয়া আক্তার  সাথীকে বিয়ে করেন আবু রায়হান। তাদের ঘরে এক কন্যা সন্তান হয়। গত ৫ বছর আগে সংসার ভেঙে যায়। ৮ বছরের কন্যা রিয়া মায়ের সাথে বসবাস করেন নানার বাড়িতে। ঢাকার কমলাপুরে চাকুরির সুবাদে আবু রায়হান সেখানে ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন। বয়োবৃদ্ধ মায়ের দেখভাল করতে প্রতি সপ্তাহে ছুটির দিনে বাড়ি চলে আসেন। মায়ের দেখাশুনা ও বাড়ির পাহাড়া দিতে প¦ার্শবর্তী অনন্তপুর গ্রামের দশম শ্রেণির ছাত্র রাজু (১৬) কে বাড়ির পরিচার্যক হিসেবে রাখেন। তাকে মাসিক বেতন ও লেখাপড়ার খরচও দিতেন। গত বৃহস্পতিবার বাড়িতে এসে রায়হান ও রাজু একই ঘরে থাকেন। কথাবার্তায় অন্যদিনের চাইতে একটু অসংলগ্নতা দেখতে পাওয়ার কথা জানান মেঝো ভাইয়ের স্ত্রী জোৎসনা বেগম। পরদিন শুক্রবার কর্মস্থলে যাওয়ার গাড়িতে উঠিয়ে দেওয়ার জন্য পরিচার্যক রাজু ও তার বন্ধু জিতুল বাড়ি থেকে নিয়ে যায়। এরপর থেকে নিখোঁজ থাকে কাস্টমসের সিপাহী আবু রায়হান।

নিহতের ভাগ্নে জাহিদুল ইসলাম হৃদয় বলেছেন, রাজু ও জিতুল মিলে আমার মামা রায়হান কে অপহরন করে হত্যা করেছে। তারা দু’জনেই মাদকাসক্ত। নিখোঁজ থাকার পর মামার ইসলামী ব্যাংকের একাউন্ট থেকে এটি এম কার্ডে টাকা উত্তোলন করা হয়েছে।
বড় ভাই নুরুল ইসলাম তালুকদার জানিয়েছেন, শুক্রবার রাতে আবু রায়হানকে বাড়িতে না পেয়ে রাজুকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি জানিয়েছে, অফিসের ফোনে জরুরি ঢাকায় যেতে তাকে কাহালগাঁও বাজারে পৌছে দিয়েছেন। তার কথা মধ্যেই ছিল রহস্যতা, কিন্তু বুঝতে পারিনি। আমার সহজ সরল ভাইকে কেন হত্যা করালো ওরা ? রাজুর লেখাপড়াসহ সব খরচ দিত রায়হান, রাজু গ্রেপ্তার হলেই সব কিছু বের হয়ে আসবে।

ফুলবাড়িয়া থানার ওসি রাশেদুল হাসান জানান, ঘাতকরা আবু রায়হানকে হত্যার পর লাশ ১৫ টুকরো করে তিনটি ট্রাভেল ব্যাগের ভরে বাড়ির পাশে নির্ঝন এলাকায় একটি পরিত্যক্ত পুকুরে ফেলে রাখে। ধারনা করা হচ্ছে ৭ থেকে ৮ দিন আগে হত্যা করা হয়েছে। লাশের টুকরো গুলো একেবারে পঁচেগেছে। নিখোঁজের তিনদিন পর থানায় জিডি করেন। এরপর থেকে পুলিশ কাজ করছে। হত্যা কান্ডে জড়িতদের দ্রুত সময়ের মধ্যে গ্রেপ্তার করা হবে।

ময়মনসিংহ অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আব্দুল্লাল আল মামুন জানিয়েছেন, প্রাথমিক ভাবে মনে হচ্ছে পরিকল্পিত ভাবে হত্যা করা হয়েছে। মরদেহর সুরতহাল করা হয়েছে। আগামীকাল (সোমবার) লাশের ময়না তদন্তের জন্য মর্গে প্রেরণ করা হবে। কাজ করা হচ্ছে আশা করছি দ্রুত সময়ের মধ্যে রহস্য উৎঘাটন করা হবে। বাড়ির কেয়ারটেকার বিষয়েও অনুসন্ধান করা হচ্ছে বলে পুলিশের এ কর্মকর্তা জানিয়েছে।
সংবাদটি শেয়ার করুন :
প্রতিবেদকের তথ্য
SH.AL

SH.AL

© স্বত্বাধিকারঃ যায়যায়দিন
কারিগরী সহযোগিতায় MULTISOFT