খুলনার কয়রা উপজেলায় ফ্যামিলি কার্ড শুমারির জন্য কর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও চরম ভোগান্তির অভিযোগ উঠেছে। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশে বিলম্ব, আবেদন জমার জন্য অল্প সময় নির্ধারণ, অস্পষ্ট নির্দেশনা, নির্ধারিত সময়ে পরীক্ষা শুরু না করা এবং দিবাগত রাত ২টা পর্যন্ত ব্যবহারিক ও মৌখিক পরীক্ষা নেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন চাকরিপ্রার্থীরা। অভিযোগের তীর নিয়োগ কমিটির দিকেই।
পরীক্ষার্থীদের অভিযোগ, সমাজসেবা অধিদপ্তরের আওতায় ইউনিয়ন সুপারভাইজার ও তথ্য সংগ্রহকারী নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি ২৩ জুলাই দুপুরের পর প্রকাশ করা হলেও সেখানে প্রকাশের তারিখ হিসেবে ২১ জুলাই উল্লেখ করা হয়।
আবেদনপত্র জমার শেষ সময় ছিল ২৫ জুলাই। এর মধ্যে ২৪ ও ২৫ জুলাই সরকারি ছুটি থাকায় অনেক আবেদনকারী প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সত্যায়ন করতে পারেননি। এছাড়া বিজ্ঞপ্তিতে আবেদনপত্রে উল্লেখিত এরিয়া নম্বর স্পষ্ট না থাকায় অনেকেই অফিসে গিয়েও এ বিষয়ে কোনো সহযোগিতা পাননি বলে অভিযোগ করেন।
দুই দফা তারিখ পরিবর্তনের পর রোববার সকাল ১০টায় ব্যবহারিক ও মৌখিক পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা থাকলেও তা শুরু হয় দুপুর ১২টার দিকে। ওই দিন দক্ষিণ বেদকাশী, উত্তর বেদকাশী ও মহারাজপুর ইউনিয়নের মোট ৩৩৩ জন আবেদনকারীর পরীক্ষা দিবাগত রাত ২টা পর্যন্ত চলে। উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ওই দিন ৬৮ জন পরীক্ষার্থী অনুপস্থিত ছিলেন।
গভীর রাত পর্যন্ত পরীক্ষা চলায় বিশেষ করে নারী পরীক্ষার্থীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েন। দূর-দূরান্ত থেকে আসা অনেক আবেদনকারী রাত গভীর হওয়ায় বাড়ি ফিরতে সমস্যায় পড়েন। কেউ কেউ যানবাহন না পেয়ে দীর্ঘ পথ হেঁটে বাড়ি ফিরেছেন বলেও অভিযোগ করেন।
মহারাজপুর ইউনিয়নের লক্ষ্মীখোলা গ্রামের আবেদনকারী শাহাদাত হোসেন বলেন, “রাত ২টায় ভাইভা শেষ করে বাড়ি পৌঁছাতে রাত ৩টারও বেশি বেজে যায়। অনেক নারী পরীক্ষার্থীকে রাত সাড়ে ১১টা পর্যন্ত ইউএনও কার্যালয়ের বারান্দায় অপেক্ষা করতে হয়েছে। কেউ কেউ ৮ থেকে ১০ কিলোমিটার হেঁটে বাড়ি ফিরেছেন।”
তথ্য সংগ্রহকারী পদে আবেদনকারী শারমিন আক্তার বলেন, “স্বামীর সূত্রে আমি মহারাজপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা। এর আগেও দুটি শুমারিতে কাজ করেছি। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার পরও প্রথমে আমার আবেদন বাতিল করা হয়। পরে আপিলে আবেদন গ্রহণ করা হয়েছে জানিয়ে আমাকে ভাইভায় ডাকা হয়। কিন্তু সারাদিন অপেক্ষার পর রাতে জানানো হয় আমার আবেদন গ্রহণ করা হবে না। আমার ভাইভাও নেওয়া হয়নি।”
আরেক আবেদনকারী তানিয়া বলেন, “ভাইভার তারিখ কয়েকবার পরিবর্তন হওয়ায় নতুন তারিখ জানতে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। সকাল থেকে না খেয়ে অপেক্ষা করতে করতে রাত ৯টার দিকে অসুস্থ হয়ে পড়ি। অনেক নারী পরীক্ষার্থী ছোট সন্তান বাড়িতে রেখে এসেছিলেন। রাত সাড়ে ১১টার পর বাড়ি ফিরতে হয়েছে, যা নিরাপত্তার জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ ছিল।”
উত্তর বেদকাশী ইউনিয়নের আবেদনকারী হায়দার আলী বলেন, “বিজ্ঞপ্তিতে শুধু শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ সত্যায়নের কথা বলা হলেও জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি সত্যায়িত না থাকার অজুহাতে আমার আবেদন বাতিল করা হয়েছে। এতে নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।”
সোমবার সরেজমিনে দেখা যায়, আমাদী ও কয়রা সদর ইউনিয়নের ব্যবহারিক ও মৌখিক পরীক্ষা সকাল ১০টায় শুরু হওয়ার কথা থাকলেও তা শুরু হয় দুপুর পৌনে ১২টার দিকে। এছাড়া আগের দিন অনুপস্থিত থাকা উত্তর বেদকাশী ইউনিয়নের একজন আবেদনকারীকে পরদিন ভাইভা দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন উপস্থিত পরীক্ষার্থীরা। এতে অন্যান্য আবেদনকারীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়।
উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, কয়রা উপজেলায় ফ্যামিলি কার্ড শুমারির জন্য ৭ জন সুপারভাইজার ও ৬৩ জন তথ্য সংগ্রহকারীসহ মোট ৭০ জন নিয়োগ দেওয়া হবে। এসব পদের বিপরীতে সুপারভাইজার পদে ১৩৮টি এবং তথ্য সংগ্রহকারী পদে ১ হাজার ১৪টি আবেদন জমা পড়ে। প্রাথমিক যাচাই-বাছাইয়ে ৩৫৬টি আবেদন বাতিল করা হলেও পুনঃযাচাইয়ের পর ২০০টি আবেদন গ্রহণ করা হয়।
কয়রা কেয়ার ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক মহসিন আলম বলেন, “সরকারি নিয়োগ কার্যক্রমে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও প্রার্থীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। গভীর রাত পর্যন্ত পরীক্ষা নেওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়। এতে বিশেষ করে নারী পরীক্ষার্থীরা নিরাপত্তা ও যাতায়াতজনিত সমস্যায় পড়েছেন।”
অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা ও নিয়োগ কমিটির সদস্যসচিব মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, “২১ জুলাই বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের কথা থাকলেও ওই সময় আমি জেলা পর্যায়ের প্রশিক্ষণে ছিলাম। পাশাপাশি একজন আত্মীয়ের মৃত্যুজনিত কারণে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে। সকাল ১০টায় পরীক্ষা শুরুর কথা থাকলেও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার অনুপস্থিতির কারণে তা সম্ভব হয়নি।”
তবে গভীর রাত পর্যন্ত পরীক্ষা গ্রহণ এবং আগের দিন অনুপস্থিত একজন আবেদনকারীকে পরদিন পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়ার অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, “এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলুন।”
এ বিষয়ে জানতে কয়রা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠিয়েও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।