বাংলাদেশের স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে গেলেও এমন কিছু প্রশ্ন রয়েছে, যেগুলো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও জটিল হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম তার অন্যতম। এই অঞ্চলের ইতিহাস, জাতিগত বৈচিত্র্য, ভূমি-অধিকার, শান্তিচুক্তি, সাংবিধানিক অবস্থান এবং "আদিবাসী" বনাম "উপজাতি" বিতর্ক—সব মিলিয়ে এটি কেবল একটি আঞ্চলিক ইস্যু নয়; বরং রাষ্ট্রচিন্তা, জাতীয় পরিচয় এবং সাংবিধানিক দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাক্ষেত্র।
দুঃখজনকভাবে, এই বিতর্কে অনেক সময় যুক্তির চেয়ে আবেগ, গবেষণার চেয়ে রাজনৈতিক অবস্থান এবং সংলাপের চেয়ে মেরুকরণ বেশি গুরুত্ব পায়। ফলে প্রকৃত সমস্যাগুলো আড়ালে থেকে যায়।
পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের মোট ভূখণ্ডের প্রায় এক-দশমাংশ জুড়ে বিস্তৃত। রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান নিয়ে গঠিত এই অঞ্চলে বহু জাতিসত্তার মানুষ বসবাস করেন। চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, ম্রো, বম, খুমি, চাক, খিয়াং, পাংখোয়া, লুসাইসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠী শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তাদের নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক ঐতিহ্য বহন করে আসছে। একই সঙ্গে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাঙালিও এই অঞ্চলের স্থায়ী নাগরিক। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রাম একটি বহুজাতিক, বহুভাষিক এবং বহুসাংস্কৃতিক বাস্তবতার প্রতীক।
ঔপনিবেশিক যুগে ব্রিটিশরা ১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম রেগুলেশনের মাধ্যমে অঞ্চলটির জন্য বিশেষ প্রশাসনিক ব্যবস্থা প্রবর্তন করে। সেই ব্যবস্থার উদ্দেশ্য ছিল স্থানীয় রীতিনীতি ও ভূমি ব্যবস্থাপনার বিশেষত্ব বিবেচনা করা; স্বাধীন রাষ্ট্রের রাজনৈতিক মর্যাদা দেওয়া নয়।
১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময় পার্বত্য চট্টগ্রাম পূর্ব পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়। স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মের পর নতুন রাষ্ট্র একটি অভিন্ন নাগরিকত্ব ও সাংবিধানিক কাঠামো প্রতিষ্ঠা করে। কিন্তু পার্বত্য অঞ্চলের প্রতিনিধিদের একাংশ মনে করেছিলেন, তাদের স্বতন্ত্র পরিচয় ও প্রশাসনিক দাবিগুলো যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি। সেই অসন্তোষই পরবর্তী সময়ে দীর্ঘ সংঘাতের জন্ম দেয়।
১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি ছিল সেই সংঘাত নিরসনের একটি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক উদ্যোগ। এই চুক্তির মাধ্যমে আঞ্চলিক পরিষদ, জেলা পরিষদ, ভূমি কমিশনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গঠনের কথা বলা হয়। কিন্তু বাস্তবায়নের গতি, আইনগত ব্যাখ্যা এবং প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা নিয়ে এখনো মতপার্থক্য রয়েছে। ফলে শান্তিচুক্তি আজও রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু।
এই বাস্তবতার মধ্যেই "আদিবাসী" শব্দটি নিয়ে তীব্র বিতর্ক গড়ে ওঠে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে জাতিসংঘের **United Nations Declaration on the Rights of Indigenous Peoples (UNDRIP)** আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক পরিচয়, ভাষা, ভূমি এবং আত্মনিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত কিছু নীতিগত অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়। তবে এই ঘোষণাপত্র কোনো দেশের সংবিধানকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিবর্তন করে না এবং প্রতিটি রাষ্ট্র তাদের নিজস্ব সাংবিধানিক কাঠামো ও আইন অনুযায়ী এর বাস্তবায়ন নির্ধারণ করে।
বাংলাদেশের সংবিধানে "আদিবাসী" শব্দটি ব্যবহৃত হয়নি। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংযোজিত অনুচ্ছেদ ২৩ক-এ "উপজাতি, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা ও সম্প্রদায়"-এর সংস্কৃতি সংরক্ষণ ও বিকাশের কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে সংবিধান দেশের সকল নাগরিকের সমান অধিকার, সমমর্যাদা এবং বৈষম্যহীনতার নিশ্চয়তা দেয়। ফলে বর্তমান সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে রাষ্ট্রের অবস্থান এবং কিছু অধিকারকর্মী ও গবেষকের অবস্থানের মধ্যে পরিভাষাগত ও নীতিগত পার্থক্য বিদ্যমান।
তবে পরিভাষার বিতর্ক যেন বাস্তব সমস্যাগুলোকে আড়াল না করে। পার্বত্য অঞ্চলে ভূমি বিরোধ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা, যোগাযোগ অবকাঠামোর বৈষম্য, কর্মসংস্থানের ঘাটতি, বন ও পরিবেশ সংরক্ষণ, নিরাপত্তা এবং আইনশৃঙ্খলা—এসবই নাগরিক জীবনের মৌলিক প্রশ্ন। এগুলোর সমাধান ছাড়া কোনো নামকরণই মানুষের জীবনমান বদলে দিতে পারে না।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা দেখায়, একেকটি দেশ একেক ধরনের সাংবিধানিক ও ঐতিহাসিক বাস্তবতার ভিত্তিতে নীতি গ্রহণ করেছে। কানাডা, নিউজিল্যান্ড বা নরওয়ের মডেল যেমন রয়েছে, তেমনি এমন রাষ্ট্রও আছে যারা নাগরিক পরিচয়কে সাংবিধানিক ভিত্তি হিসেবে প্রাধান্য দেয়। তাই বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও নীতি নির্ধারণের ভিত্তি হওয়া উচিত দেশের সংবিধান, ইতিহাস এবং জনগণের সামগ্রিক স্বার্থ।
আজ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন এমন একটি দৃষ্টিভঙ্গি, যেখানে পার্বত্য চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে সম্মান জানানো হবে, একই সঙ্গে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব এবং সকল নাগরিকের সমঅধিকারও সমানভাবে সুরক্ষিত থাকবে। পরিচয়ের ভিন্নতা যেন বৈরিতার কারণ না হয়ে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহাবস্থানের ভিত্তি হয়।
পার্বত্য চট্টগ্রাম কোনো বিচ্ছিন্ন ভূখণ্ড নয়; এটি বাংলাদেশের ইতিহাস, ভূগোল, সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এখানকার মানুষের অধিকার নিশ্চিত করা যেমন রাষ্ট্রের দায়িত্ব, তেমনি জাতীয় ঐক্য, আইনের শাসন এবং সাংবিধানিক শৃঙ্খলা রক্ষাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এই দুই লক্ষ্য পরস্পরবিরোধী নয়; বরং ন্যায়ভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার মাধ্যমে একসঙ্গে অর্জন করা সম্ভব।
পরিশেষে বলা যায়, এমন একটি বাংলাদেশই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত, যেখানে ভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য বিভেদের নয়, জাতীয় সমৃদ্ধির শক্তিতে পরিণত হবে; যেখানে কোনো নাগরিক নিজেকে প্রান্তিক বা বঞ্চিত মনে করবেন না এবং রাষ্ট্রও তার সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে অবিচল থাকবে। ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে, অবিশ্বাস সংঘাতের জন্ম দেয়, আর ন্যায়বিচার টেকসই শান্তির ভিত্তি গড়ে তোলে। তাই পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রশ্নে আবেগ কিংবা মেরুকরণ নয়, প্রয়োজন সংলাপ, আইনের শাসন, পারস্পরিক সম্মান এবং সংবিধানের প্রতি অটল অঙ্গীকার। এই ভারসাম্যপূর্ণ পথেই জাতীয় ঐক্য আরও সুদৃঢ় হবে, গণতন্ত্র হবে আরও অর্থবহ এবং বাংলাদেশ বিশ্বদরবারে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, আত্মবিশ্বাসী ও মানবিক রাষ্ট্র হিসেবে আরও দৃঢ় অবস্থান গড়ে তুলতে সক্ষম হবে ইনশাল্লাহ।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
ই-মেইল: [email protected]