ঢাকা | বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৬ ইং | ২২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সাম্য ও সম্প্রীতির বাংলাদেশ গড়তে দেশব্যাপী নজরুল বর্ষ পালনের আহবান

author
যাযাদি রিপোর্ট

প্রকাশিত : ৭ আগস্ট, ২০২৬ সকাল ১১:৫৫
ad003
বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও সাম্যবাদী দর্শণকে ধারণ করে সারাদেশে ব্যাপকভাবে ‘নজরুল বর্ষ’ পালনের দাবি জানিয়েছেন বিদ্রোহী দ্যা নজরুল সেন্টার ও জাতীয় নারী সাহিত্য পরিষদ।

বুধবার (৫ আগস্ট) বিকেল ৩.৩০ ঘটিকায় নয়াপল্টনে সংগঠনের কার্যালয়ে, আন্দোলন ও  সংগ্রামে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের গান, কবিতা ও বাণী শীর্ষক আলোচনা ও জুলাই বিপ্লবের কবিতা ও পুথিপাঠ অনুষ্ঠানে বক্তরা এ দাবি জানিয়েছেন । 

বক্তারা আরো বলেন, একটি বৈষম্যহীন, মুক্তচিন্তার ও সম্প্রীতির বাংলাদেশ বিনির্মাণে নজরুলের কালজয়ী সৃষ্টি এবং আদর্শ বর্তমান সময়ে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। তাই নজরুল প্রেমি ও অনুরাগী সকল ব্যাক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে “নজরুল বর্ষ উদ্যাপন নাগরিক কমিটি” গঠন করে সরকারের পাশা পাশি সারাদেশে ব্যাপকভাবে ‘নজরুল বর্ষ’ পালনে সকলকে এগিয়ে আসার অনুরোধ করেন।

বক্তারা দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সেমিনার, সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা, উৎসব এবং নজরুল মেলার আয়োজন করার আহবান জানান। জাতীয় কবির বিদ্রোহী ও মানবিক সত্তাকে ধারণ করতে পারলে সমাজে পরমতসহিষ্ণুতা বৃদ্ধি পাবে এবং সাম্য-সম্প্রীতি আরও সুদৃঢ় হবে।

নজরুলের সাম্যবাদ ও সম্প্রীতির চেতনা শুধু কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না রেখে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে উদযাপন করা উচিত। একটি শান্তিময়, প্রগতিশীল ও সম্প্রীতির বাংলাদেশ গড়তে দেশব্যাপী নজরুল বর্ষ পালন সময়ের দাবি। সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সাবেক মন্ত্রী ও বিএলডিপির চেয়ারম্যান এম নাজিম উদ্দীন আল আজাদ। মূখ্য আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, সংগঠনের উপদেষ্টা ও বিদ্রোহী দ্যা নজরুল সেন্টার এর নির্বাহী পরিচালক, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব মুহাম্মদ আতা উল্লাহ খান, বিশেষ অতিথি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখেন গণ রাজনৈতিক জোট-গর্জো সভাপ্রধান সৈয়দ মইনুজ্জামান লিটু, স্বনামধন্য কবি ও গীতিকার সাবেক এডিশনাল এসপি বীরমুক্তিযোদ্ধা এটিএম ফারুক আহমেদ, বাংলা একাডেমি এর আজীবন সদস্য বরেণ্য ছড়াকার  আতিক হেলাল, আল-হামরা বিল্ডার্স লি: এর ফাউন্ডার ও ডিরেক্টর জনাব আব্দুল মবিন খান, তর্কবাগীশ সাহিত্য পরিষদ এর সভাপতি কবি প্রফেসর ডক্টর হাবিবুর রহমান খান এবং সাধারণ সম্পাদক কবি ও গীতিকার  শাহীন  আলম  খান, কবি মোহাম্মদ শাহানুর ইসলাম, কবি শাহী সবুর, বিএলডিপির প্রেসিডিয়াম সদস্য এস এম  আমান উল্লাহ, কবি  এ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মাহমুদ, কবি ও গীতিকার যিশুপদ আচার্য্য, বাচিক শিল্পী শাহীনা আফরোজ, কবি ও বাচিক শিল্পী এ্যাডভোকেট শিমুল পারভীন ও কবি ইসমাত আরা। 

বাচিক শিল্পী ও জাতীয় নারী সাহিত্য পরিষদ এর সহ-সাধারণ সম্পাদক শাহীনা আফরোজের উপস্থাপনায় জাতীয় নারী সাহিত্য পরিষদ এর  সভাপতি ও বাংলাদেশ ব্যাংক এর সাবেক এডিশনাল ডিরেক্টর কবি হাসিনা মমতাজ হাসি এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভার কোরআন তেলওয়াত করেন কবি ইসমত আরা ও স্বাগত বক্তব্য রাখেন জাতীয় নারী সাহিত্য পরিষদ এর সাধারণ সম্পাদক এবং  বিদ্রোহী দ্যা নজরুল সেন্টার এর ডিরেক্টর কবি ও কথাসাহিত্যিক নাসরিন ইসলাম শেলী। শুরুতে জাতীয় নারী সাহিত্য পরিষদ এর থিম সং জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম এর “জাগো নারী জাগো বহ্নিশিখা” এর চার লাইন সমবেত কন্ঠে পরিবেশন করেন জাতীয় নারী সাহিত্য পরিষদ এর নেতৃবৃন্দ। 

প্রধান অতিথি এম নাজিম উদ্দীন আল আজাদ তাঁর বক্তব্যে বিদ্রোহী কবিতার চিত্রপট ও প্রমীলা দেবীর সাথে কবি কাজী নজরুল ইসলামের বিবাহ বন্ধনের বিষয়। তিনি বলেন, কবি নজরুল সারাজীবন শোষণের বিরুদ্ধে, মানবতার পক্ষে এবং ধর্মীয় গোঁড়ামির ঊর্ধ্বে উঠে সম্প্রীতির গান গেয়েছেন। তাঁর কবিতা ও গানে বারবার ধ্বনিত হয়েছে মানুষে মানুষে সমতার বাণী। দেশের বর্তমান সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে তরুণ প্রজন্মের মাঝে নজরুলের এই উদার দর্শণ ছড়িয়ে দেওয়া জরুরি। সারাদেশে বছরব্যাপী নজরুল বর্ষ উদযাপনের মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত তাঁর সাহিত্যকর্ম, নাটক ও সংগীতের ব্যাপক প্রসার ঘটানো সম্ভব।

মূখ্য আলোচক মুহাম্মদ আতা উল্লাহ খান বলেন, বাঙালির প্রতিটি স্বাধিকার আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ ও ২৪ এর বিপ্লবে যে নামটি অবিনাশী চেতনার প্রতীক হিসেবে কাজ করেছে, তিনি হলেন আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার গান গেয়ে তিনি শত বছর আগেই তাঁর দূরদর্শী লেখনীতে ‘বাংলাদেশ’ নামের এক স্বাধীন সার্বভৌম ভূখণ্ডের স্বপ্ন বুনেছিলেন। 

‘বাংলাদেশ’ নামের প্রথম উ”চারণ কবি নজরুলই প্রথম কবি যাঁর কবিতায় “বাংলাদেশ” নামটি অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও মমতাময় রূপে উ”চারিত হয়েছিল। তিনি লিখেছিলেন, “নমঃ নমঃ বাংলাদেশ মম, চির মনোরম চির মধুর...”। তাঁর “দূর আরবের স্বপ্ন দেখি বাংলাদেশের কুটির হতে” গানের মাধ্যমে এ দেশের মাটির প্রতি তাঁর গভীর আত্মিক টান ফুটে ওঠে। ঔপনিবেশিক শাসনের শৃঙ্খলে আবদ্ধ থেকেও তিনি এই ভূখণ্ডের একটি স্বাধীন আত্মপরিচয়ের স্বপ্ন দেখেছিলেন।

বিশেষ অতিথি সৈয়দ মইনুজ্জামান লিটু বিদ্রোহী কবির কবিতার বিভিন্ন অংশ তুলে ধরে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেন,  তিনি বলেন, আমরা বলবো বলতে চাই যে ন্যায় নৈতিকতার উৎকর্ষে পৌঁছাতে হলে আমরা কবি নজরুলকে লালন ও ধারণে সর্বো”চ পর্যায়ে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি সুন্দর সমাজ ও দেশ উপহার দিতে।  

বিশেষ অতিথি কবি এ্যাডভোকেট আবদুল্লাহ আল মাহমুদ তার বক্তব্যে বলেন যে, কবি ও সাহিত্যিকগণ শেষ বয়সে এসে বহু কষ্টে দিনাতিপাত করেন। যার প্রমাণ কবি নজরুলসহ যারা মৃত্যবরণ করেছেন তাদের জীবনী পড়লেই পাওয়া যায়। অথচ তাদের নিরলস কঠোর প্রচেষ্টা বিশ্বকে প্রতিকূল হতে অনুকুল পরিবেশ সৃজনে আজীবন কাজ করে গেছেন। এ থেকে উত্তরণের পথ খুঁজে বের করে সমাধান এর উদ্যোগ নিতে হবে কবিদের জীবদ্দশায়। কবিদের জীবদ্দশায় তাঁদের মুল্যায়ন করা অনস্বীকার্য।   

বিশেষ অতিথি কবি এটিএম ফারুক আহমেদ তাঁর বক্তব্যে বিদ্রোহী কবি’র- বল বীর, বল উন্নত মম শির! শির নেহারি আমারি নতশির ওই শিখর হিমাদ্রির! বিদ্রোহী কবিতার দু’লাইন দিয়ে শুরু করেন এবং বলেন, সম্প্রতিকালে যে সকল কবি ও সাহিত্যিকগণ লিখে থাকেন হাজার হাজার কবিতা। কেউ কি তা পড়েন? জীবদ্দশায় মুল্যায়ন হয় না ঐ যে “কারার ঐ লৌহ কপাট, ভেঙে ফেল কররে লোপাট”  কবিতাটি আজও শুনলে সকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে সো”চার প্রতিবাদী কন্ঠস্বর জেগে ওঠে সকল অন্যায় নির্মূল করণে। অথচ কবি’র জীবদ্দশায় এর মুল্যায়ন হয়নি। প্রতিটি শব্দের ঝংকারে জেগে ওঠবে মৃত্যু ভিসুভিয়াসও। কালোত্তীর্ণ এই “বিদ্রোহী” কবিতাটি ১৯২১ সালে রচনা করেছিলেন। প্রতিটি আন্দোলন সংগ্রামে আজও এই কবিতা শ্রবণে মানব সত্তার রন্ধ্রে রন্ধ্রে দাউদাউ লেলিহান শিখা জ্বলে ওঠে। আমার লেখা সহস্র কবিতা মনে রাখে না কেউ, কিš‘ মনে রাখে কর্মে থাকাকালীন সময়ে কোনদিন কাকে খুনের দায়ে গ্রেফতার করেছিলাম, বিশৃঙ্খলা রোধে কাকে কি শাস্তি দিয়েছিলাম। আমরা ভবিষৎ প্রজন্মের মনে-প্রাণে বিদ্রোহী কবিকে লালন-ধারণ করার সর্বো”চ চেষ্টা চালিয়ে যাবো। 

বিশেষ অতিথি কবি প্রফেসর ডক্টর  হাবিবুর রহমান খান বলেন, ১৯২১ সালে আমাদের জাতীয় কবি যে কালজয়ী কবিতা রচনা করেছিলেন। সকল অন্যায় নির্মূলকরণে আন্দোলন ও সংগ্রামে তা আজও প্রতিফলিত। তৎকালীন সময়ে বিশ্বের অনেক দেশের খ্যাতনামা কবি ও সাহিত্যিকগণ অন্যায়ের বিরূদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন এবং রচনা করেছিলেন কবিতা ও নাটক। কিš‘ আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম এর কবিতার মত জাগরণ সৃষ্টি করতে পারেনি।

বিশেষ অতিথি ছড়াকার আতিক হেলাল বলেন, সাম্যের কবি সম্প্রীতির কবি দ্রোহের কবি কাজী নজরুল ইসলাম। যুগে যুগে আন্দোলন ও সংগ্রামে তার দ্রোহের কবিতা ও গান অনুপ্রেরণা দেয় উজ্জীবিত করে দেশ ও জাতিকে রক্ষা করতে। শোষকের বিরূদ্ধে শাণিত তরবারী হাতে নিতে। স্বৈরশাসকের ভীত নড়িয়ে দিতে অতঃপর মূল উৎপাটন করতে। ১৯৭১ সালের কথা এবং ২০২৪ সালে আমাদের জাতীয় কবি’র কবিতা ও গান আমাদের কীভাবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখতে প্রেরণা যোগিয়েছে এবং শোষকের মূল উৎপাটন করে তার চাক্ষুষ প্রমাণ আমরা পেয়েছি।

স্বাগত বক্তব্যে কবি ও কথাসাহিত্যিক নাসরিন ইসলাম শেলী বলেন, প্রকৃত অর্থে শিক্ষক হলো জাতি গড়ার কারিগর, আর লেখকরা নির্মল ধরণী সৃজনে নিরলস প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা মৃত্যুবদি চালিয়ে যান। পাশাপাশি সাংবাদিকরা ভুমিকা পালন করেন সরজমিনে থেকে। এই তিন ধরনের শ্রেণীর আন্তরিকতা সঠিক দায়িত্ব পালন ও নিরন্তর চেষ্টায় বৈষম্যহীন বিশ্বগড়া সম্ভব। আমাদের জাতীয় কবি নজরুল ইসলাম কবি ও সাংবাদিক হিসেবে খেয়ে না খেয়ে সেই দূর্নিবার প্রচেষ্টায় রত ছিলেন। সব বাঁধা ভয় ডিঙিয়ে আপ্রাণ চেষ্টা তাঁর ক্ষুরধার লিখনী তে প্রমাণ পাওয়া যায়। যদি আমরা বিদ্রোহী কবিকে অন্তরে লালন ও ধারণ করতে পারি তাহলে আমরা দেশের সব প্রতিকূল অব¯’ান হতে মুক্তি পেতে পারবো ইনশাআল্লাহ।

বিশেষ অতিথিদের বক্তব্যের ফাঁকে ফাঁকে একটি গান পরিবেশন করেন কবি ইসমত আরা, স্বরচিত পুথিপাঠ, গান ও কবিতা আবৃত্তি করে শোনান কবি ও বাচিক শিল্পী এ্যাডভোকেট শিমুল পারভীন। স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি করেন কবি ও বাচিক শিল্পী শাহীনা আফরোজ, কবিতা পাঠ করেন কবি শাহী সবুর, কবি ও গীতিকার যিশুপদ আচার্য্য, কবি মোহাম্মদ শাহানুর ইসলাম ও তর্কবাগীশ সাহিত্য পরিষদ এর সাধারণ সম্পাদক শাহীন আলম খাঁন। সবশেষে উক্ত সভার সভাপতি পুথি সম্রাজ্ঞী হাসিনা মমতাজ হাসি স্বরচিত পুথি পাঠ শেষে উপস্থিত সম্মানিত কবি-সাহিত্যিক ও সম্মানিত গুনীজনদের ধন্যবাদ জানিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণা করেন।
সংবাদটি শেয়ার করুন :
প্রতিবেদকের তথ্য
SH.AL

SH.AL

© স্বত্বাধিকারঃ যায়যায়দিন
কারিগরী সহযোগিতায় MULTISOFT