ভুল করে ফুল তুলে নিয়েছিল মেয়েটি। ফুল হাতে নিয়ে ফুলের সৌরভ নয় কাটায় ক্ষত-বিক্ষত হয় সে। যাকে ভালোবেসে ঘর ছাড়ে, সেই তাকে ফেলে চলে যায়। ছেলেটা চলে যাওয়ার সময় একবারও ভাবেনি অসহায় মেয়েটির কি হবে। কিভাবে বাচবে? শুধু নিজের সুখ, সাচ্ছন্দ্যের কথাটাই ভেবেছে। একবারের তরেও ভাবেনি, চলে গেলে মেয়েটির কি হবে। এমনকি অনাগত সন্তানের জন্যও থামেনি। শেকড় উপড়ে চলে গেছে। আরেক বৃক্ষ শাখায় ঘর বেধেছে, অন্ন আরেক রমণীর সঙ্গে। মেয়েটার নাম লিমা। সে এই শহরে পুরুষ বেশে চালায় রিকশা। কোলের সন্তানকে বাচাতে পুরুষের ছদ্মবেশে এই শহরের রাজপথে, অলিগলিতে অবিরাম রিকশা চালিয়ে চলছে। ঘুরে দেখার একটুও সময় হয় না তার।
লিমা বগুড়া জেলার মেয়ে। কিশোর বয়স পার হতে না হতেই ভালো লাগে নিজ শহরের এক যুবককে। এর পর প্রেম, পরিণয় এবং ঘর বাধা। স্বল্প বয়সের এই সিদ্ধান্ত বাবা-মা মেনে নেয়নি। প্রেম বা ভালোবাসার টানে তাকে ঘর ছাড়তে হয়। এ সময় রঙিন জীবন, রঙিন ভালোবাসা। অভাব, ক্ষুধা এবং অনিশ্চয়তায় এক সময় সব ধূসর হতে থাকে। তারপর কোনো এক ভোরে হাতের বাধন আলগা করে লিমাকে ফেলে স্বামী চলে যায়। হয়তোবা এই শহরে কোথাও বসবাস করছে ভিন্ন নারীর সঙ্গে। চলে যাওয়ার আগে স্বামী একবারের তরেও ভাবেনি নিজ সন্তানের ভবিষ্যৎ কি হবে। নিজ সুখের আশায় মেয়ে এবং ভালোবাসার মানুষসহ সব ফেলে চলে যায়।
স্বামী চলে যাওয়ার পর লিমা এক অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যায়। কোথায় কোনখানে যাবে কিছুই ভেবে পায় না। নিজ বাড়িতে ফেরার পথও বন্ধ। কিংবা বাবা-মার কাছে আর ফিরে যেতে চায় না। এদিক-ওদিক কাজ খুজে না পেয়ে অবশেষে সিদ্ধান্ত নেয় অটো চালানোর। এ শহরে অটো চালাবে একটি মেয়ে এ কেমনে হয়। তার ওপর কাচা বয়স। দেখতেও মোটামুটি খারাপ নয়। কখন কোন দানব সবকিছু তছনছ করে দেবে এর কি কোনো নিশ্চয়তা আছে! লিমা মনস্থির করে ফেলে, পুরুষের ছদ্মবেশে অটো চালানোর। যেই ভাবনা, সেই কাজ। লিমা রাজধানীর রাজপথে রিকশা চালাতে নেমে যায়।
আমরা যে লিমার মুখোশটা খুলে দিলাম, এখন কি হবে তার? আমরা কি ভেবে দেখেছি। যাই বলি না কেন এখন আর সাচ্ছন্দ্যে রিকশা চালাতে পারবে না। মানুষ এবং দানব দুটোর সামনেই তাকে পড়তে হবে। মুখোমুখি হতে হবে মানুষ আর দানবের। তার কর্ম জীবন প্রচার হওয়ার পর তাকে এখন থেকে আরেক চ্যালেঞ্জের সামনে দাড়াতে হবে।
আজ থেকে প্রায় সাত দশক আগে বিখ্যাত উর্দু সাহিত্যিক সাদাত হোসেন মান্টো ‘লাইসেন্স’ নামে একটি লেখা লিখেছিলেন। গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র হলো নীটি। সে ছিল এক জন কোচোয়ানের স্ত্রী। বা এক জন সংগ্রামী নারী। স্বামীর মৃত্যুর পর বা চরম দারিদ্র্যের মাঝে পড়ে যায়। ক্ষুধার তাড়নায় নিজের ও পরিবারের জীবিকা নির্বাহের জন্য টাংগা চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়। সে পেশাদার কোচোয়ান হতে চায়। টাংগা চালানোর জন্য তার প্রয়োজন হয় একটি সরকারি ‘লাইসেন্স’। সে যখন প্রশাসনের কাছে লাইসেন্সের জন্য আবেদন করে, তখন শুরু হয় সমাজ ও ব্যবস্থার আসল রূপের প্রকাশ। সমাজ বা রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ এক জন গরিব, অসহায় এবং সুন্দর নারীকে কেবল এক জন স্বাধীন ও আত্মনির্ভরশীল শ্রমিক হিসেবে দেখতে চায় না। তারা তার মেহনত বা সততাকে মূল্য না দিয়ে তাকে ভিন্ন নজরে দেখে। তার অসহায়ত্ব ও শরীরকে শোষণের হাতিয়ার বানাতে চায়।
শেষ পর্যন্ত সে লাইসেন্স তো পায়ই, কিন্তু মান্টো অত্যন্ত নিপুণভাবে ফুটিয়ে তোলেন যে, এই লাইসেন্স কেবল একটি কাগজের টুকরো না। এটি প্রমাণ করে যে কিভাবে পুরুষ তান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা এবং দুর্নীতিগ্রস্ত প্রশাসন এক জন খেটে খাওয়া নারীর স্বাধীনতা ও আত্মসম্মানকে পদদলিত করে তাকে প্রতি মুহূর্তে পরাধীন ও শোষিত করে। সাত দশক পর হয়তো পৃথিবী অনেক পাল্টেছে। কিংবা আগের জায়গায় থেমে আছে। তা না হলে লিমাকে কেন অটো চালাতে পুরুষের ছদ্মবেশ নিতে হবে!
তবে লিমা এখন আর একক যুবতী লিমা না। লিমা এখন গোটা বাংলাদেশ। যার কর্মের ঘামে বাংলাদেশ এগিয়ে চলছে। তাই রাষ্ট্র এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে তার পাশে দাড়াতে হবে । নিতে হবে দায়িত্ব।
লেখক-

শাহীন রাজা : সিনিয়র সাংবাদিক