ঢাকা | রবিবার, ০৪ অক্টোবর ২০২৬ ইং | ১৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দায়িত্ব, সহমর্মিতা, সততা ও বিশ্বস্ততায় গড়ুক নতুন সমাজ

author
এ ইউ দৌলা

প্রকাশিত : ১০ আগস্ট, ২০২৬ বিকেল ৪:০৪
এ আই নির্মিত প্রতীকী ছবি এ আই নির্মিত প্রতীকী ছবি
ad003
অতি প্রাচীনকাল থেকেই মানবজাতি দল, উপদল, শ্রেণি, সম্প্রদায়, বংশ কিংবা ভৌগোলিক অবস্থানে বিভক্ত হয়ে এসেছে। তবে এই শতবিধ বিভক্তির মাঝেও যে বিভাজনটি মানব সমাজকে অনাদিকাল থেকে সবচেয়ে মারাত্মক আর গভীরভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে, তা হলো ধনী ও দরিদ্রের ব্যবধান।

কিন্তু কীভাবে জন্ম নিল এই ব্যবধান? স্রষ্টা তো আমাদের মাঝে কোনো কম-বেশি করেননি। শারীরিক কাঠামো, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কিংবা অক্সিজেন গ্রহণের ক্ষমতার দিক থেকে মানুষে-মানুষে কোনো পার্থক্য নেই। তাহলে মানুষ কীভাবে এই বিশাল ব্যবধানের শিকলে বন্দি হলো? সভ্যতার এই স্বর্ণযুগেও জন্মের পরপরই কেউ কেউ অঢেল সম্পদের মালিক, আর কেউবা চরম দারিদ্র্যের অতল গহ্বরে; এই অসাম্য কি কেবলই ভাগ্যের লিখন, নাকি এর পেছনে রয়েছে অন্য কোনো গভীর ইঞ্জিনিয়ারিং?

মানব ইতিহাসে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্যের সূত্রপাত কীভাবে হয়েছিল, তা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ব্রিটিশ দার্শনিক জন লক বলেছিলেন, প্রাকৃতিক অবস্থায় মানুষ ছিল পরিপূর্ণ স্বাধীন। গাছের ফলমূল, পশুর দুধ ও মাংস খেয়ে তারা জীবন ধারণ করত। সেখানে ব্যক্তিগত সম্পদের কোনো ধারণা ছিল না; ঠিক যেমনটি আজও বনের পশুপাখিদের মধ্যে দেখা যায়। কিন্তু যখনই মানুষ কৃষিকাজ শিখল এবং এক খণ্ড জমিকে ‘নিজের’ বলে দাবি করল, সেই মুহূর্ত থেকেই ব্যক্তিগত সম্পদ অর্জনের ধারণার জন্ম হলো। যে ব্যক্তি বেশি জমি নিজের নিয়ন্ত্রণে নিল, সেই হয়ে উঠল ধনী।

অন্যদিকে কার্ল মার্কস ধনী-দরিদ্রের বিশ্লেষণ করেছেন পণ্য উৎপাদনের ব্যবস্থা ও শ্রেণি সম্পর্কের নিরিখে। তাঁর দর্শনের মূল ভিত্তি ছিল পুঁজিবাদের অভ্যন্তরীণ বৈপরীত্য। তিনি দেখিয়েছেন, পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় সম্পদের মালিকানা অল্প কিছু মানুষের হাতে কুক্ষিগত হয়, আর শ্রমিক তার নিজের শ্রমের প্রকৃত মূল্য ও তার সৃজিত পণ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। মার্কসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পুঁজিবাদের মূল লক্ষ্য হলো শ্রমিকের পাওনা কমিয়ে দিয়ে উৎপাদিত পণ্য অধিক মূল্যে বিক্রির মাধ্যমে মুনাফা বৃদ্ধি করা। এই প্রক্রিয়া একদিকে যেমন এক শ্রেণির হাতে পাহাড়সম সম্পদ জমায়, অন্যদিকে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে করে তোলে বঞ্চিত। মার্কস আরও দেখিয়েছেন, একজন ব্যবসায়ী বা পুঁজিপতি ব্যক্তিগতভাবে খুব দয়ালু বা ভালো মানুষ হলেও, এই পুঁজিবাদী কাঠামোর কারণেই তিনি শ্রমিক ঠকানোর কৌশল থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন না। অর্থাৎ, ধনী ও দরিদ্রের এই ব্যবধান কেবল ব্যক্তিগত ত্রুটি নয়, বরং একটি সুসংগঠিত ব্যবস্থার অনিবার্য ফলাফল।

এই প্রেক্ষাপটে মার্কস শ্রমিকের ন্যায্য পাওনা আদায়ের আন্দোলনে ডাক দিয়েছিলেন। তিনি সাম্য ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে সমাজকে পুনর্গঠনের স্বপ্ন দেখেছিলেন। তাঁর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ফরাসি বিপ্লব, রুশ বিপ্লব ও চীনা বিপ্লবের মতো বড় বড় রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটেছিল। কোটি কোটি মানুষের জীবনের বিনিময়ে অনেক রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সমাজতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, তাতে কি ধনী ও দরিদ্রের ব্যবধানের সেই আদি পাপ মোচন হয়েছিল? না, হয়নি। বাস্তবতা বলছে, পুঁজিবাদী কাঠামোর মতো সব সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রেও একই পাপ দেখা গেছে; সেখানেও শাসক শ্রেণি ধনী হয়েছে আর শাসিতরা সেই একই বঞ্চনা ও বৈষম্যের যাতাকলে পিষ্ট হয়েছে।

তাহলে মার্কস আসলে কতটা সঠিক ছিলেন? তিনি বলেছিলেন, পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় মালিকপক্ষ শ্রমিকের শ্রমের সঠিক মূল্য দেয় না বা দিতে পারে না বলেই বৈষম্যের জন্ম হয়। কিন্তু ভাবুন তো, ২০৫০ সালে যদি বিশ্বের পণ্য উৎপাদন ব্যবস্থা পুরোপুরি যন্ত্র বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে এবং ফ্যাক্টরিতে কোনো শ্রমিকের প্রয়োজনই না থাকে, তখন কি ‘শ্রম চুরির’ অভিযোগ আর প্রাসঙ্গিক থাকবে? কিংবা ধরুন, আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থাগুলোর সম্মিলিত এক সফল প্রকল্পের মাধ্যমে ২০৩০ সালে জগতের সব দরিদ্র মানুষের মাথাপিছু আয় দৈনিক ১০০০ ডলার ছাড়িয়ে গেল, তবে কি বৈষম্যের দহন মুছে যাবে? কল্পনা করুন, জগতের প্রতিটি মানুষের জন্য মানসম্মত পোশাক, ঘর এবং পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা হলো। কিন্তু যাদের কোটি কোটি ডলারের সম্পদ আছে, তারা সেই সম্পদ দিয়ে উচ্চমূল্যে ল্যাবরেটরিতে তৈরি কৃত্রিম অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ (হার্ট, কিডনি, লিভার, ফুসফুস) কিনে দেড় শ বছর বাঁচার সুযোগ নিল। কিন্তু যাদের সেই সামর্থ্য নেই, তারা কি তখন নিজেদের বঞ্চিত মনে করবে না? সেই অসমতা থেকে কি নতুন কোনো আন্দোলনের ডাক আসবে না?

সমস্যার গভীরে তাকালে দেখা যায়, মার্কস যা বুঝেছিলেন সেটিই মূল সমস্যা নয়। সমস্যা আসলে পুঁজিবাদ কিংবা সমাজতন্ত্রে নয়, এর বীজ রয়েছে অন্য কোথাও। পুঁজিবাদের অর্থনৈতিক শোষণকে তিনি স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করেছিলেন ঠিকই, কিন্তু তিনি যেটি ধরতে পারেননি সেটি হল, সব ধরনের শোষণের সবচেয়ে গভীর ও অদৃশ্য স্তরটি বাস করে মানুষের অন্তরে, যার নাম ‘মর্যাদাবোধের সংকট’। মানুষ স্বভাবতই সম্মান আর মর্যাদা পেতে আকাঙ্ক্ষা করে; এই আকাঙ্ক্ষা মানুষের সারভাইভাল বা অস্তিত্ব রক্ষার একটি বায়োলজিক্যাল ইন্সটিংক্ট। কিন্তু কোথায় রয়েছে মানুষের সেই ইপ্সিত মর্যাদা? অন্যরা আমার সম্পর্কে কী ভাবছে সেটিই কি আমার মর্যাদা নির্ধারণ করে, নাকি আমি নিজেকে কেমন মানুষ বলে বিচার করি, সেইটিই আমার প্রকৃত সম্মান? মর্যাদা কি বাইরের জগতে বসবাস করে, নাকি সেটি মানুষের অন্তরের গভীরে?

আসলে সেটি ডুবে থাকে আমাদের সামাজিক শিক্ষায়। অতি প্রাচীনকাল থেকেই সমাজ ‘বস্তু সম্পদের নিয়ন্ত্রণ’ এবং ‘মর্যাদা’কে সমার্থক হিসেবে দেখতে অভ্যস্ত হয়েছে। জন্মগ্রহণের পর ভাষা শিক্ষার মতো মৌলিক শিক্ষার মতোই আমাদের শেখানো হয় যে, অর্থবিত্তই হলো মর্যাদার প্রধান ও একমাত্র মানদণ্ড। মানুষের মর্যাদা ও সম্মান তার বিত্তের মাঝে নিহিত, এই ভ্রান্ত ধারণার কারণেই জগতে যত বৈষম্য, অন্যায় ও অপরাধের জন্ম হয়েছে। ‘সম্পদ মানেই ক্ষমতা, আর ক্ষমতা মানেই মর্যাদা’ এই অনুভবের চর্চা থেকেই সব অসুস্থ প্রতিযোগিতার শুরু। এরই ফলে মানুষ মানুষকে পণ্য হিসেবে ব্যবহার করেছে; সততা ও সহমর্মিতার চেয়ে চাতুর্য ও শোষণের  কৌশল বেড়েছে। মর্যাদা অর্জনের একমাত্র পথ হিসেবে ক্ষমতা ও প্রভাবকে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। ফলস্বরূপ, জগৎজুড়ে এমন এক সমাজ ব্যবস্থা সৃষ্টি হয়েছে যেখানে মানুষের নৈতিক ভারসাম্য লোপ পেয়েছে আর অস্থিরতা আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে। আজ আমরা এমন এক সমাজ ব্যবস্থায় আটকে গেছি যেখানে একজন দরিদ্র মানুষ চিন্তিত এই ভেবে যে তিনি খাবার কীভাবে কিনবেন, চাকরি কীভাবে পাবেন, চিকিৎসা কীভাবে করাবেন। আবার যিনি পাহাড়সম সম্পদের ওপর দাঁড়িয়ে আছেন, তিনিও যে খুব সুখী, তেমন দাবি করতে পারছেন না; কারণ সব সময় তিনি নিজের সেই সম্পদের নিরাপত্তা এবং সেই সম্পদ আরও কীভাবে বাড়ানো যায়, সেই দুশ্চিন্তা নিয়ে  নির্ঘুম। যিনি শাসক, তিনিও চরমভাবে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত এই আতঙ্কে যে, যেকোনো সময় বিরোধী শক্তি তাকে অপসারণ করার কৌশল করতে পারে। আসলে এই ব্যবস্থায় আমরা সকলেই চিন্তিত, আতঙ্কিত ও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। কেউ হয়তো রাজপ্রাসাদে বাস করছেন, দামি পোশাক পরছেন আর দামি খাবার খাচ্ছেন, কিন্তু দিনশেষে কেউই জীবনকে উপভোগ করতে পারছেন না।

তাই সত্যিকার স্বাধীনতার স্বাদ উপভোগ করার জন্য, মানবতার মুক্তির জন্য, বৈষম্যমুক্ত ও শোষণমুক্ত জগৎ গঠনের লক্ষ্যে সম্মান ও মর্যাদার ভ্রান্ত ধারণা থেকে মুক্তি পাওয়া দরকার। এখন ‘মর্যাদা’র সংজ্ঞাকেই নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করা প্রয়োজন। জগৎজুড়ে সামাজিক চেতনার ইঞ্জিনিয়ারিং করা দরকার, যেখানে উচ্চারণ করা হবে, সম্পদের পাহাড় মানেই মর্যাদা নয়; বরং যিনি যত বেশি দায়িত্বশীল আচরণ করেন, তিনিই তত বেশি মর্যাদাবান। মানুষের প্রকৃত মর্যাদা তার ব্যাংক ব্যালেন্সে নয়, বরং তার আত্মসম্মানবোধে নিহিত, যে আত্মসম্মানবোধের ভিত্তিতে থাকবে চারটি মূল স্তম্ভ:

দায়িত্ববোধ: নিজের এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা অনুভব করা। যিনি যত গভীরভাবে দায়িত্ব পালন করেন, তিনিই প্রকৃত মর্যাদাবান।
সহমর্মিতা: অন্যের কষ্টে পাশে দাঁড়ানো এবং পারস্পরিক সহযোগিতাই হবে সামাজিক শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড। যিনি যত বেশি সহমর্মী, তিনিই তত বেশি মর্যাদাবান।

বিশুদ্ধ সততা: কোনো চাতুর্য বা শর্টকাট নয়, বরং বিশুদ্ধ সততার জীবনই হল গৌরবের উৎস।

প্রতিশ্রুতি রক্ষা: বিশ্বস্ততাই মানব চরিত্রের শ্রেষ্ঠ অলংকার, তাই যে যত বেশি বিশ্বস্ত, সেই তত বেশি মর্যাদাবান।

আমরা যদি এই চারটি নিয়ামককে মানব জীবনের সেরা সম্পদ, সেরা অর্জন, সেরা সম্মান ও সেরা মর্যাদা হিসেবে নতুন সামাজিক মানদণ্ড বানাতে পারি, তবে রাষ্ট্রতন্ত্র যা কিছুই হোক জগতের মানুষ তখন একে অন্যের প্রতি, প্রকৃতি ও পরিবেশের প্রতি অনেক বেশি দায়িত্বশীল হয়ে উঠবে। তখন সামাজিক জীবনে আস্থার শক্তি শতগুণ বৃদ্ধি পাবে। মানুষেরা একে অন্যের প্রতি  অনেক বেশি সহমর্মী হওয়াতে সামাজিক নিরাপত্তা হাজার গুণ বৃদ্ধি পাবে। আর এমন হলে অস্থিরতা ও অসুস্থ প্রতিযোগিতার বদলে গড়ে উঠবে পারস্পরিক আস্থা ও সংহতির এক নতুন বিশ্ব।

লেখক-
এ ইউ দৌলা
(মাইন্ড-ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ের গবেষক)

সংবাদটি শেয়ার করুন :
প্রতিবেদকের তথ্য
SH.AL

SH.AL

© স্বত্বাধিকারঃ যায়যায়দিন
কারিগরী সহযোগিতায় MULTISOFT