ঢাকা | রবিবার, ০৪ অক্টোবর ২০২৬ ইং | ১৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্বাধীনতা: অধিকার, দায়িত্ব-কর্তব্য ও প্রজ্ঞার সমন্বয়

author
এ ইউ দৌলা

প্রকাশিত : ১৩ আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ৩:১৯
ad003
গত পর্বে আমরা হেগেলের দর্শনের মধ্য দিয়ে দেখেছি যে, স্বাধীনতা কোনো স্থির বিষয় নয়; এটি একটি চলমান সামাজিক প্রক্রিয়া যেখানে মানুষ জ্ঞানের মাধ্যমে সচেতন হয়, পুরনোকে ভেঙ্গে ফেলে নতুন কল্যানের পথে এগিয়ে যায়।  স্বাধীনতার এই পথে প্রতিটি নাগরিকের জীবন, সম্পদ, সম্মান ও অধিকারের দায়িত্ব গ্রহণ করে রাষ্ট্র যেন অভিভাবক হয়ে নির্দিষ্ট নিয়মের মাঝে সমাজকে পরিচালিত করে। কিন্তু প্রশ্ন হল, স্বাধীনতার এই প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্র কিংবা সমাজ যখন দায়িত্বের বদলে ক্ষমতার দণ্ড হাতে তুলে নেয়, তখন ব্যক্তি মানুষের স্বাধীনতার কী হয়? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের অবশ্যই জন স্টুয়ার্ট মিলের শরণাপন্ন হতে হবে। ১৯ শতকের বিখ্যাত এই ব্রিটিশ দার্শনিক ও অর্থনীতিবিদ তাঁর অমর গ্রন্থ ‘অন লিবার্টি’ -এ স্বাধীনতার এক ভিন্ন এবং অত্যন্ত সাহসী সংজ্ঞা দাঁড় করিয়েছেন।

জন স্টুয়ার্ট মিলের কথাগুলো বোঝার জন্য প্রথমে আমাদের বুঝতে হবে তিনি কোন সময়ের কথা বলছেন। শিল্প বিপ্লবের পর আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা যখন শক্তিশালী হচ্ছে, তখন মিল আশঙ্কা করেছিলেন যে, অভিভাবকত্বের দায়িত্বের আড়ালে রাষ্ট্র নিজেও কোন কোন সময় নিপীড়ক হতে পারে; কিন্তু তার চেয়েও বড় আরেকটি নীরব কিন্তু ভয়ংকর শক্তির উত্থান তিনি অনুভব করেছিলেন সেই সময়। একে তিনি বলেছিলেন Tyranny of the Majority বা ‘সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বৈরাচার’। মিল বললেন, রাষ্ট্র যখন আইনের মাধ্যমে মানুষের ওপর শাসন চালায়, তখন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে মানুষ কথা বলতে পারে। কিন্তু সমাজ যখন সামাজিক চাপের মাধ্যমে  ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর মতামত কিংবা কোনো ব্যক্তির স্বাধীন চিন্তাকে রুদ্ধ করে, তখন সেই পরাধীনতা অনেক বেশি গভীর ও ক্ষতিকর হয়ে ওঠে।

কিন্তু মিলের স্বাধীনতা দর্শনের মূল ভিত্তিটি হলো ‘ক্ষতি নীতি’ বা Harm Principle; তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলেছেন, কোনো ব্যক্তির স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ করার অধিকার কেবল তখনই রাষ্ট্রের বা সমাজের থাকে, যখন সেই ব্যক্তির কোনো কাজ অন্য কোনো মানুষের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যদি কোনো ব্যক্তির কাজ কেবল নিজেকেই প্রভাবিত করে, তবে সমাজ বা রাষ্ট্রের কোনো অধিকার নেই তার ওপর নাক গলানোর। মিলের কাছে স্বাধীনতা মানে স্বৈরতন্ত্র, একনায়কতন্ত্র ও রাজতন্ত্রের হাত থেকে মুক্তি, কিন্তু তার চেয়েও বড় হল নিজের মন এবং নিজের শরীরের ওপর ব্যক্তির নিজস্ব সার্বভৌমত্ব। আধুনিক যুগের একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে কথাটি শুনতে বেশ ভালো লাগে, কিন্তু জন স্টুয়ার্ট মিলের ‘হার্ম প্রিন্সিপল’ শুনতে যতটা সহজ মনে হয়, বাস্তবে প্রয়োগের ক্ষেত্রে এটি ততটাই জটিল। কেননা ‘ব্যক্তিগত কাজ’ এবং ‘সামাজিক প্রভাব’-এর মাঝে কোনো স্পষ্ট দেয়াল তিনি দেখাতে পারেননি। মিল নিজেই তাঁর দর্শনে এই জটিলতা সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। একজন মানুষ আসলে কী করবে বা করবে না, তার সীমা নির্ধারণ করতে গেলে আমাদের ‘ক্ষতি’ বলতে ঠিক কী বোঝানো হচ্ছে, তা বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। মিলের দর্শনে ‘ক্ষতি’ বলতে শারীরিক ক্ষতি, সম্পত্তির ক্ষতি কিংবা অন্যের মৌলিক অধিকারের সরাসরি লঙ্ঘনকেই বোঝানো হয়েছে। কিন্তু আধুনিক জীবনের বাস্তবতায় এই দর্শন আমাদের আরও গভীরে চিন্তা করতে বাধ্য করে।

ধরুন, একজন ভাবলেন তিনি আজ খুব আনন্দিত, তাই উচ্চস্বরে মিউজিক বাজিয়ে রাস্তার মোড়ে আনন্দ-নৃত্য করবেন। স্বাভাবিক ভাবে এটি তাঁর ব্যক্তিগত স্বাধীনতা বলে মনে হতে পারে, কিন্তু সেই মিউজিকের শব্দ কি চারপাশের মানুষদের অন্তত একজনের জন্যও কষ্টের কারণ হতে পারে না? পাশের বিল্ডিঙয়ে যে ছাত্রটি তার পরীক্ষার পড়া মুখস্থ করার চেষ্টা করছে, যে অসুস্থ মানুষটি একটু বিশ্রাম নিতে চাইছেন, তাদের জন্য সেই মিউজিক কি আনন্দের নাকি ক্ষতির কারণ? এখানে কি একজনের স্বাধীনতা অন্যের অধিকারকে ক্ষুণ্ন করছে না?

আবার ধরুন, একজন মানুষ ভাবলেন যে তিনি পোশাকহীন অবস্থায় রাস্তায় হাঁটবেন, এটাই তার স্বাধীনতা। মিলের যুক্তিতে এটি সরাসরি কাউকে শারীরিক আঘাত করছে না, কিন্তু মনস্তত্ত্ব ও সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এটি মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। সমাজ হলো এমন একটি স্থান যেখানে মানুষ যা দেখছে এবং যা শুনছে, তার সবই চারপাশের মানুষের মানসিক জগতে প্রভাব ফেলে এবং অবচেতনেই তারা সেসব ভালো কিংবা মন্দ শিখে ফেলে এবং তাদের আচরণ বদলে যায়। মানুষ যখন ভালো কিছু দেখে, তখন সেই ভালো বোধ তার মস্তিষ্কে সঞ্চারিত হয়ে ভালোর কারণ হয়; আবার যখন মানুষ খারাপ কিছু শোনে কিংবা দেখে, তা তাদের অন্তরে বিষের মতো জমা হতে থাকে।

কিংবা ধরুন, আমি ব্যক্তিগতভাবে অনেক অর্থ সম্পদের মালিক, তাই শখ মেটাতে বহুমূল্য মনিমাণিক্য খচিত একটি অত্যন্ত দামি ও সুদৃশ্য প্রাসাদ বানালাম। দামি প্রাসাদ বানানোর বিষয়টি আমার সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অংশ, যা অন্যের অধিকার ক্ষুণ্ন করে না। কিন্তু আমার বাড়িটি যখন অন্যদের দৃষ্টির আড়াল না করে সকলের দেখার বস্তু হল, তখন মানুষদের অন্তরে ঠিক কেমন প্রতিক্রিয়া হবে? মানুষেরা সেই সুন্দর বাড়িটির দিকে তাকিয়ে নিজেদের অন্তরে এক তীব্র অভাববোধে আক্রান্ত হতে পারে। কেউ কেউ হয়ত অস্ফুটভাবে বলবে, একদিন সেও এমন বাড়ি বানাবে; কেউ কেউ হয়ত চিন্তা করবে তার নিজের বাড়িটা তেমন ভালো নয় তাই আগেরটা ভেঙ্গে আরও সুন্দর বাড়ি বানাতে হবে। ভেবে দেখুন, আমার সেই সুদৃশ্য বাড়িটি কীভাবে অন্য মানুষদের অন্তরে হীনম্মন্যতার জন্ম দিচ্ছে, কীভাবে তাদের অন্তরে অভাবের বিষ ঢেলে দিচ্ছে।  বিষয়টি শুধু বাড়ী নয়, সেটা আমাদের পোশাক, গহনা, চেহারা বা অন্য যেকোন কিছুরই প্রদর্শনী বা বিজ্ঞাপন হতে পারে। আপনি নিশ্চয় জানেন, আজকের জগতে বিশ্বব্যাপী যত অন্যায়, অবিচার আর দুর্নীতি, তা কেবল অন্যের কী আছে আর আমার নিজের কী নেই, সেই অভাববোধ থেকেই জন্ম নেয়। তাহলে বলুন, সুদৃশ্য প্রাসাদ বানিয়ে অন্যদের দেখানোর যে ব্যবস্থা আমি করলাম, তা কতটা ভয়ংকর সামাজিক ক্ষতির কারণ হতে পারে!

এখন আমরা জানি সোশ্যাল মিডিয়ায় মন্দ কথা বলা, মন্দ সংবাদ প্রচার করা, মাদক সেবনের দৃশ্য কিংবা অন্যের চরিত্রহননমূলক পোস্ট কীভাবে শ্রোতা ও দর্শকের মস্তিষ্কে ক্ষতি করে। আমরা জানি এসব দৃশ্য কিংবা পোস্ট দেখে অপ্রাপ্তবয়স্করা উৎসাহিত হয়। মনোবিজ্ঞান বলছে, যে কোনো ক্ষতিকর বিষয়ের উপর সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য বলা কোন কথা উচ্চারণ কিংবা প্রচারের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত সতর্ক থাকা প্রয়োজন। তাই নিশ্চিতভাবে স্বাধীনতার সীমা নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু রাষ্ট্র কিংবা সমাজ নয় বরং প্রতিটি মানুষকেই প্রজ্ঞার চর্চা করতে হবে; সমাজে সৃষ্টি করতে হবে প্রজ্ঞার সংস্কৃতি। কেননা সরাসরি শারীরিক বা অর্থনৈতিক ক্ষতি হলে রাষ্ট্র অনায়াসে হস্তক্ষেপ করতে পারে; কিন্তু কোনো কাজ যদি অন্যের মূল্যবোধে আঘাত করে বা মানসিক ক্ষতির সৃষ্টি করে, তবে সেটিকে রুখতে সামাজিক শক্তির প্রয়োজন।

আজকের যুগে দাঁড়িয়ে মিলের এই চিন্তাটি কেন এত জরুরি? দেখুন, আমরা যখন কথা বলছি, তখন সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করছে; বিজ্ঞাপন আমাদের মন-মগজ আর জীবনকে তাদের নিয়ন্ত্রণে নিতে মড়িয়া। আজ যদি আমি এমন কোনো মত প্রকাশ করি যা সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মতের সাথে মেলে না, তবে মুহূর্তের মধ্যেই এক অদৃশ্য জনতা আমার চরিত্র হরণ শুরু করে। এই যে ‘সোশ্যাল টিয়ারানি’ বা সামাজিকভাবে কাউকে একঘরে করার প্রবণতা, মিল একেই স্বাধীনতার সবচেয়ে বড় শত্রু বলে চিহ্নিত করেছিলেন। তার মতে, যদি কোনো সমাজে একজন ব্যক্তির কণ্ঠরোধ করা হয়, তবে সেই সমাজ আসলে পুরো মানবজাতির উন্নয়নের কণ্ঠরোধ করল। কারণ, হয়তো সেই ব্যক্তিটি সক্রেটিস কিংবা গ্যালিলিওর মতোই সঠিক ছিলেন, আর আমরা তার কথা না শুনে তাকে হত্যা করেছি।  তিনি বললেন, যদি কোনো মানুষ ভুলও বলে, তবুও তার কথা বলার সুযোগ থাকা উচিত; কারণ তর্কের মাধ্যমেই সত্য উন্মোচিত হয়, মানব সভ্যতা এগিয়ে যায়। অবশ্য স্বাধীনতা কেবল ব্যক্তিজীবনের আনন্দ ভোগের নাম নয়। মিল মনে করতেন, স্বাধীনতা হলো মানুষের বৌদ্ধিক বিকাশের একমাত্র পথ। যদি আমরা আমাদের পছন্দমতো চিন্তা করার, নিজের জীবন নিজে বেছে নেওয়ার এবং নিজের মতো করে বেঁচে থাকার স্বাধীনতা না পাই, তবে মানুষ কেবল এক ধরণের যন্ত্রে পরিণত হয়। তবে মিলের এই স্বাধীনতা দর্শনে সতর্কতা ছিল; তিনি বিশ্বাস করতেন, স্বাধীনতা মানে উচ্ছৃঙ্খলতা নয়। তিনি বলেছিলেন, যে ব্যক্তি নিজের স্বাধীনতার অপব্যবহার করে অন্যের ক্ষতি করে, তাকে নিয়ন্ত্রণ করার অধিকার রাষ্ট্রের আছে।

আজকের পৃথিবীর দিকে তাকালে দেখা যায়, কর্পোরেট জগত আমাদের পছন্দের স্বাধীনতাকে বিজ্ঞাপনের জালে বন্দি করে ফেলেছে। আমরা যাকে ‘চয়েস’ বা স্বাধীনতা বলছি, তা কি আসলে আমাদের নিজস্ব সিদ্ধান্ত? নাকি এও এক ধরণের সংখ্যাগরিষ্ঠের চাপ কিংবা কৌশলে আমাদের মস্তিস্ককে নিয়ন্ত্রণ করার ষড়যন্ত্র? জন স্টুয়ার্ট মিলের দর্শনে স্বাধীনতা মানে হলো এমন একটি সমাজ তৈরি করা, যেখানে মানুষ স্বাধীনভাবে প্রজ্ঞার মাধ্যমে নিজের ভালো নিজে বুঝে নিতে পারে। তিনি মনে করতেন, মানুষ তার নিজের জীবনের সবচেয়ে ভালো বিচারক। যদি সে ভুলও করে, তবে সেই ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার স্বাধীনতাটুকু তার থাকা উচিত; কেননা ব্যক্তির আত্মনির্ভরশীলতাই হলো স্বাধীনতার প্রকৃত ভিত্তি। মিল বলেছিলেন, স্বাধীনতা মানে কেবল বেঁচে থাকা নয়, স্বাধীনতা মানে নিজের চিন্তায় বিকশিত হওয়া।

এবার বলুন তো, আপনার অভ্যাস, আপনার চিন্তার ধরন এবং আপনার মত প্রকাশের ক্ষেত্রে আপনি কি আজও মিলের সেই ‘স্বতন্ত্র স্বাধীন মানুষ’ হতে পেরেছেন? নাকি আপনি সংখ্যাগরিষ্ঠের ভয়ে আপনার আসল সত্তাকে গোপন করে চলছেন? (পর্ব -২)

স্বাধীনতা কি সত্যিই স্বাধীনতা? আগামী পর্বে আমরা দেখব, কার্ল মার্কস কীভাবে স্বাধীনতার এই ধারণাকে অর্থনীতি আর শ্রমের দর্পণে বিচার করেছিলেন। জানতে পড়ুন আগামী পর্ব।

(মাইন্ড-ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ের গবেষক)


সংবাদটি শেয়ার করুন :
প্রতিবেদকের তথ্য
JJD_Online

JJD_Online

© স্বত্বাধিকারঃ যায়যায়দিন
কারিগরী সহযোগিতায় MULTISOFT