২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বরের সেই রাতটি যেন এখনো অমলিন। ঘূর্ণিঝড় সিডর আঘাতের তাণ্ডবে লণ্ডভণ্ড হয়েছিল বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলা। আকাশে বজ্রপাত, প্রবল জলোচ্ছ্বাস আর মৃত্যুর গন্ধে ডাকা পড়ে গিয়েছিল গোটা উপকূল। সরকারি হিসাব অনুযায়ী হাজারো প্রাণহানি ঘটে, কিন্তু স্থানীয়রা বলেন — সংখ্যাটা ছিল আরও ভয়াবহ।
“আকাশটা লাল হয়ে গিয়েছিল, গর্জে উঠেছিল সমুদ্র। মনে হয়েছিল, আজ আর কেউ বাঁচব না, স্মৃতিচারণ করেন পাথরঘাটা সদর ইউনিয়নের মাছ ব্যবসায়ী আব্দুল কাদের মিয়া (৬৫) সিডরের পরের দিন চারদিকে মৃত্যু রাজ্য।
পরদিন ভোরে সূর্য উঠলেও চারপাশে শুধু ধ্বংসস্তূপ। মৃতদেহের সারি, ভেসে আসা নৌকা, উল্টে থাকা ঘরবাড়ি, যেন এক যুদ্ধক্ষেত্র।
বেঁচে থাকা মানুষগুলো খুঁজে বেড়িয়েছেন আপনজনকে, কেউ কাঁদছেন হারানো সন্তান বা স্বামী-স্ত্রীর বাবা-মাকে।
“সিডর আমাদের ঘর, ফসল, সবকিছু কেড়ে নিয়েছে। তখন থেকে আজও ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন বলেন স্থানীয় কৃষক হাবিবুল ইসলাম। অর্থনৈতিক টানাপোড়েন আজও কাটেনি।
সিডরের পর লবণাক্ত পানিতে নষ্ট হয়ে যায় ফসলের জমি। নারকেল, সুপারি ও পানের বরজ ধ্বংস হয়ে যায়, নৌকা-জাল, এমনি কি সখের ট্রলারট্রলার হারিয়ে বিপাকে পড়েন মৎস্যজীবীরা হয়ে যান সর্বস্বহারা।
১৮ বছর পার হলেও এ এলাকার অনেকেই এখনো দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে।
আমরা সিডরের ক্ষতি থেকে পুরোপুরি সামলে উঠতে পারিনি টেকসই ভেরিবাদ না থাকার কারণে। এখনও একবার জোয়ার এলেই আতঙ্কে থাকি বলেন স্থানীয় নারী সাহেরা বেগম। তিনি আরো বলেন
ভেরি বাঁধ মানুষের জীবন রক্ষায় একমাত্র আশ্রয় ।
সিডরের পর থেকেই পাথরঘাটার মানুষের মুখে একটাই দাবি—টেকসই ভেরি বাঁধ।
প্রতিবছর বর্ষাকালে ও উচ্চ জোয়ারে নদীভাঙনে ডুবে যায় বাড়িঘর। বাঁধ ভেঙে গেলে আবারও ফিরে আসে সিডরের আতঙ্ক।
স্থানীয় স্কুলশিক্ষক মিজানুর রহমান বলেন, প্রতিবারই আমরা নতুন করে ঘর তুলি, আবার ভেসে যায়। যদি একটা শক্ত বাঁধ হতো, তাহলে অন্তত মনে শান্তি পেতাম বারবার ঘরের জায়গা পরিবর্তন করা লাগতো না।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আংশিক সংস্কার করা হলেও স্থায়ী ও টেকসই বাঁধ নির্মাণে পর্যাপ্ত বাজেটের অভাব রয়েছে।
সদর ইউনিয়নের পদ্মাসুলিজ গ্রামের মোঃ আব্দুল হাই (৬০) বলেন, সিডর আমাদের শিখিয়েছে বাঁচার লড়াই: ভয়াল অভিজ্ঞতার পরও পাথরঘাটার মানুষ হাল ছাড়েননি। কেউ নতুন করে কৃষিকাজ শুরু করেছেন, কেউ মাছ ধরায় ফিরেছেন, কেউ সন্তানদের শিক্ষায় জোর দিয়েছেন। “সিডর আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে বাঁচার লড়াই করতে হয়। তবে এখন আমাদের বাঁচার অস্ত্র হলো টেকসই ভেরি বাঁধ বলেন জেলে রহিম দালাল।
১৮ বছর আগের সেই রাতের ভয়াবহ স্মৃতি আজও মুছে যায়নি। তবে উপকূলের মানুষের চোখে এখন একটাই স্বপ্ন— “আর কোনো সিডর নয়, আর যদি আসে—তাহলে যেন পাশে থাকে মজবুত ভেরি বাঁধ।”
আজ সিডর দিবসে যেখানে সবচেয়ে বেশি মানুষ ১৫ নভেম্বর মারা গিয়েছিল পাথরঘাটা সদর ইউনিয়নের পদ্মা ভাঙ্গলে সেই স্থানে বিকেল চারটায় পাথরঘাটা উপজেলা বিএনপির আহবায়ক চৌধুরী মোঃ ফারুকের নেতৃত্বে দোয়া মাহফিলের আয়োজন করছেন। এছাড়া আজ সকাল ১০ টায় ১৫ নভেম্বর সিডর দিবস উপলক্ষে জলবায়ু ও পরিবেশ বিষয়ক নাগরিক সংগঠন ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা) ও পাথরঘাটা উপকূল সুরক্ষা আন্দোলন এর যৌথ উদ্যোগে Global Day of Action for Climate Justice উপর রুহিতা পয়েন্টে মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়।