যাযাদি ডেস্ক
প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি, ছাত্রদল ও দলের অন্যান্য অঙ্গসংগঠন বাংলার গনতন্ত্রকামী মানুষের মুক্তির জন্য সকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছে। তারই ধারাবাহিকতায় দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ, ফ্যাসিস্ট, ও স্বৈরচার হাসিনার পতনের জন্য আন্দোলন অব্যহত রাখে। যার সর্বশেষ প্রচেষ্টা ছিল জুলাইয়ের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলে যোগদানের দিন থেকে আজ অবধি জনগনের অধিকার আদায়ে যতগুলো আন্দোলন-সংগ্রাম হয়েছে তার সবগুলোতেই অংশগ্রহণ করার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। সেগুলোর মধ্য থেকে আজকে অগ্নিঝড়া জুলাই-আগস্টে আমার অভিজ্ঞতার কিছু অংশ বলবো।
শহরটা কেমন যেন ঘোলাটে হয়ে উঠেছিল জুলাইয়ের শুরুতে। আকাশটা থম ধরে আছে, বাতাসও নিঃশব্দে হাঁটে—সবকিছু একটা অজানা বিস্ফোরণের অপেক্ষায়। আমি তখনও বুঝিনি, সামনে কী আছে। সেই সময় কোটা সংস্কার আন্দোলনের ডাক এলো। ছোট ছোট ছেলেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে দাঁড়িয়ে স্লোগান তুলছে, ব্যানার ধরছে। তারা রাজনীতি জানে না, কিন্তু অন্যায় বোঝে। পোস্টারে আঁকা স্লোগানগুলো অপেক্ষা করছে কখন তারা কন্ঠ হয়ে উঠবে।
৭ জুলাই যখন কোটা সংস্কারের দাবিতে ঢাকায় কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা মিছিল নিয়ে বের হয় তখনই এই আন্দোলনের সাথে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল একাত্মতা পোষন করে। এবং কীভাবে এই আন্দোলনকে আরও বেগবান করা যায় সেই লক্ষ্যে পরিকল্পনা করে ৷ এই দিনই আমরা ছাত্রদের সাথে কথাবার্তা বলি এবং তাদের পাশে থেকে তাদেরকে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেই।
আন্দোলনে তখন আস্তে আস্তে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ছিল। নিয়মিত যাই, দিকনির্দেশনা দিতে থাকি। তারপরই শুরু হয় পুলিশি বাঁধা; আওয়ামী দোসররা ছাত্রদের রক্তচক্ষু দেখাতে শুরু করে।
১৬ জুলাই, দেশব্যাপী সর্বাত্মক আন্দোলন চলছে। ঢাকা সহ দেশের সব জায়গায় আন্দোলনে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা অংশগ্রহণ করে। এই দিন আমার নেতৃত্বে স্থানীয় বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিয়ে কুড়িল বিশ্বরোড থেকে শুরু করে রামপুরা পর্যন্ত রাস্তা ব্লক করে দেই। এতে আন্দোলনে যোগ হয় নতুন মাত্রা। দেশের বিভিন্ন জায়গায় পুলিশ আন্দোলনকারীদের উপর গুলি ছুড়ে। রংপুরে আবু সাঈদ শহীদ হয়; শহীদ হয় ছাত্রদলের তরুণ নক্ষত্র বীর চট্টলার ওয়াসিম; শহীদ হয় আরও অনেকে।
১৮ জুলাই: আগের ২ দিনের ন্যাক্কারজনক হত্যাকান্ড জনমানুষের হৃদয়ে মারাত্মক আঘাত হানে। এক কথায় এই গনহত্যা সকলকে নাড়িয়ে তোলে। সাধারন মানুষ ঘর থেকে রাস্তায় নেমে আসতে শুরু করে। আর আন্দলনকে রূখে দিতে শহরের অলিতে গলিতে অস্ত্রসস্ত্র নিয়ে অবস্থান নেয় ফ্যাসিস্ট দোসররা। যেভাবেই হোক আন্দোলন বন্ধ করতে হবে।
সকালে বাসা থেকে বের হয়েই দেখতে পাই আওয়ামী পান্ডারা টহল দিচ্ছে রাস্তার মাথায়। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেখান থেকে কৌশল অবলম্বন করে ভিন্ন পথ দিয়ে প্রগতি স্বরণীতে গিয়ে আন্দোলনে যোগ দেই। সেখানে খুনি হাসিনার পুলিশ বাহিনী আমাদেরকে দমন করার জন্য দফায় দফায় রাবার বুলেট, সাউন্ড গ্রেনেড টিয়ারসেল নিক্ষেপ করতে থাকে। পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। আমরা রাস্তা ছাড়ি না। আমাদেরকে ছত্রভঙ্গ করতে না পেরে এক পর্যায়ে পুলিশ ক্লান্ত হয়ে যায়, কোনঠাসা হয়ে পড়ে। তখন আমাদের মাঝে নতুন শক্তির সঞ্চার হয়।
১৯ জুলাই, কমপ্লিট শাটডাউনে উত্তপ্ত ঢাকার রাজপথ। আমরা নতুন বাজার শাহজাদপুরে অবস্থান করছিলাম- আন্দোলন চলছে। এদিন পুলিশ আমাদের উপর চুড়ান্তভাবে চড়াও হয়- গুলি ছোড়ে। চলে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া আর ইট-পাটকেল নিক্ষেপ। পুলিশ টানা কয়েকঘন্টা আমাদের উপরে গুলিবর্ষণ করে। আমার চোখের সামনে পাশে থাকা ৩ জন সহযোদ্ধা মাটিতে লুটিয়ে পড়ে, কাঁপতে কাঁপতে শহীদ হয় সেখানেই। তেজোদ্দীপ্ত গরম দেহগুলো শান্ত হয়ে যায় । মুহূর্তেই আমার চোখ ঝাঁপসা হয়ে যায়, গলা দিয়ে চিৎকার বের হয়না। নির্বাক হয়ে যাই। লাশগুলো সেখানেই পড়ে থাকে। আমি কোনোমতে দৌড়ে একটু পিছনে সরে আসি। মাথায় শুধু একটা কথাই ঘুরপাক খাচ্ছিলো যোকোনো মূহুর্তে আমিও গুলিবিদ্ধ হবো। মনের মধ্যে সংকোচ, হয়তো আজকে এখান থেকে আমার আর বাসায় ফেরা হবে না। কারণ এখান থেকে আমার বাসা অনেকটা দূরে- সামনে পুলিশ, আকাশে হেলিকপ্টার ঘুরছে, তাছাড়া কোথায় না কোথায় লীগের সন্ত্রাসীরা দাড়িয়ে আছে। তখন আমি অবাক হয়ে দেখেছি, মানুষ কতটা সাহসী হতে পারে। মাত্র যেখানে লাশ পড়ল, লাশ সরিয়ে সেখানেই আবার স্লোগান শুরু। আমি সবার মুখের দিকে তাকাই, কারো চেহারায় বিন্দুমাত্র ভয় দেখিনি- দেখেছি ক্রোধ আর বিদ্রোহের আগুন। বুঝলাম কিছু কিছু সময়ে আসলে মানুষের মৃত্যুভয় কাজ করে না। মৃত্যু ভয় থাকলে কেউ কখনো যুদ্ধ যেতে পারতো না৷ এই দৃশ্য দেখেই বুঝতে পেরেছিলাম এই আন্দোলনকে আর কোনোভাবেই দমানো যাবেনা। সারাদিন আন্দোলন চললো। চললো স্লোগান, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, ইট-পাটকেল আর গুলির শব্দ। রাজপথ ভিজলো রক্ত আর ঘামে।
২০ জুলাই কারফিউ জারি হয়। ২৩ তারিখ পর্যন্ত কারফিউ থাকে। কারফিউ ভঙ্গ করে প্রতিনিয়ত আন্দোলনে অংশগ্রহন করি। আন্দোলন এখন আর কোটা সংস্কারে সীমাবদ্ধ নেই, আন্দোলন রূপ নিয়েছে গনঅভ্যুত্থানে। সাম্প্রতিক গনহত্যা, ও বছরের পর বছর আওয়ামীলীগের করা সকল অন্যায়-জুলুম-রাহাজানির বিপক্ষে জনগনের দীর্ঘদিনের চেঁপে রাখা ক্ষোভ যেন আগুন হয়ে রাজপথে উত্তাপ ছড়াচ্ছে। সবাই রাস্তায় নেমে আসে। এই সময়ে যখন আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ, নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে আমদের উপরে হামলা চালায় তখন আমরা ওদেরকে প্রতিহত করি এবং কোনঠাসা করে রাখি। কুল কিনারা না পেয়ে সারাদেশে হাসিনার পুলিশ বাহিনী ছাত্রদল এবং বিএনপির নেতাকর্মীদের নির্বিচারে গণ আটক ও নির্যাতনের মতো জঘন্য কাজ শুরু করে দেয়। একইভাবে, সিসিটিভি এবং ভিডিও ফুটেজ পর্যবেক্ষণ করে যখন ডিবি পুলিশ আমাকে আটক করার জন্য খুঁজতে থাকে। তখন তাদের উপস্থিতি টের পেয়ে সাথে সাথে আমি আমার মোবাইল ফোন সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে ফেলি এবং আমার বাসা থেকে দূরে এক পরিচিত ব্যক্তির বাসায় গিয়ে ৪-৫ অবস্থান করি। তাদের মাধ্যমে জানতে পারি পুলিশ আমাকে আটক করতে বসুন্ধরা এবং গুলশানে আমার পরিচিত বেশ কয়েকজন ব্যক্তির বাসায় হানা দিয়েছে। ভাগ্য সহায় থাকায় শেষ পর্যন্ত আমি তাদের হাত থেকে নিস্তার পাই।
এরপর ২৮ জুলাই রাতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কয়েকজন শীর্ষ নেতা আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষনা দেয়। তখন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান, আগামীর রাষ্ট্রগঠনে বর্তমান প্রজন্মের আস্থার প্রতীক জনাব তারেক রহমান আমাদের স্পষ্ট নির্দেশনা দেন যে স্বৈরাচারের পতন নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কোনোভাবেই এই আন্দোলন বন্ধ করা যাবে না। তার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা রাজপথে পুরোদমে আন্দোলন চালিয়ে যাই।
৩ আগস্ট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ছাত্র-জনতার সমাবেশকে সফল করার জন্য আমরা ৭-৮ জন ২টি সিএনজি করে রামপুরা থেকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজে গিয়ে অবস্থান করি এবং ছাত্রদলের বিভিন্ন ইউনিটের নেতাকর্মীরা সেখানে জড়ো হতে থাকে। একপর্যায়ে আওয়ামী যুবলীগের সন্ত্রাসীরা আমাদের উপর হামলা করে। তাদেরকে প্রতিহত করে আমরা ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা সেখান থেকে মিছিল নিয়ে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গিয়ে অবস্থান নিই। এবং সরকার পতনের ১ দফা দাবি উত্থাপনের মধ্য দিয়ে সমাবেশের সমাপ্তি ঘটে।
পরবর্তী দিন, ৪ আগস্ট সকাল বেলা ঠিক আগের দিনের মতো রামপুরা থেকে পুলিশ এবং অন্যান্য বাহিনীর বাঁধা উপেক্ষা করে শাহবাগ মোড়ে পৌঁছাই। সেখানে অবস্থানরত আওয়ামী সন্ত্রাসীদের রাজপথ থেকে বিতাড়িত করে, আমরা ছাত্রদল ও বিএনপির অন্যান্য অঙ্গসংগঠনের নেতৃবৃন্দ সন্ধ্যা পর্যন্ত অবস্থান করি। মূলত এই দিনই স্বৈরাচার হাসিনা ও তার দলবল বুঝতে পার তাদের পতন অনিবার্য এবং তা কেবল এখন সময়ের ব্যাপার।
৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের চুড়ান্ত আন্দোলনের ডাক দেয় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল। তারই ধারাবাহিকতায় ৫ তারিখ প্রথম প্রহরে যমুনা ফিউচার পার্কের সামনে লোকজন জড়ো হতে থাকে। সেখান থেকে আমি ও কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাবেক সাধারন সম্পাদক একটি মিছিল নিয়ে সামনে অগ্রসর হলে পুলিশের বাঁধার সম্মুখীন হই। তাদেরকে উপেক্ষা করে আমরা গনভবনের অভিমুখে অগ্রসর হই।
এভাবে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের মাধ্যমে ঢাকা শহরের অলিগলি থেকে জাতীয়তাবাদী দল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা মিছিল নিয়ে গনভবনের অভিমুখে যাত্রা শুরু করে। কিছুক্ষণের মধ্যেই গনতন্ত্রের হত্যাকারী, স্বৈরতন্ত্রের মানসকন্য শেখ হাসিনার পতন নিশ্চিত হয়। মিছিল তখন "এই মুহূর্তে খবর এলো, শেখ হাসিনা পালিয়ে গেলো" স্লোগানে প্রকম্পিত হয়। ঢাকা সহ সারা বাংলাদেশের গনতন্ত্রকামী মানুষ বিজয়োল্লাসে ফেটে পড়ে। এবং জাতি দীর্ঘদিনের পরাধীনতার শিকল থেকে মুক্তি পায়। একইসঙ্গে বাকস্বাধীনতা রুদ্ধকারী এক স্বৈরযুগের অবসান ঘটে।